নারীর ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব অনেক। পিরিয়ডের দিনগুলোতে জীবাণুমুক্ত পরিবেশ বজায় না থাকলে নানা ধরনের জীবাণুর সংক্রমণ হতে পারে। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস। তাই অপরিচ্ছন্নতা ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়—বিশেষ করে জরায়ুমুখের ক্যানসার। কিশোরী বয়স থেকে তাই এ ব্যাপারে সচেতন থাকা জরুরি।
এইচপিভি নামের দুষ্ট ভাইরাসঃ জরায়ুমুখের ক্যানসারের পেছনে নাটের গুরু হিসেবে ধরা হয় এই ভাইরাসকে। পুরো নাম হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস। এই ভাইরাসের সংক্রমণ ধীরে ধীরে কোষের গঠনকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়। নানা স্তর পেরিয়ে একসময় রূপ নেয় আগ্রাসী ক্যানসারে। এইচপিভি ভাইরাস আছে এক শর বেশি ধরনের। এর মধ্যে এইচপিভি ১৬ ও ১৮ মূলত ক্যানসারের জন্য প্রায় ৭০ শতাংশ দায়ী।আশার কথা, বেশির ভাগ এইচপিভি সংক্রমণ আপনাআপনি সেরে যায়। কিছু সংক্রমণ যেতে পারে ক্যানসারের দিকে।

সুরক্ষার আছে উপায়ঃ জরায়ুমুখের ক্যানসার থেকে সুরক্ষা পাওয়ার উপায় আছে। ঝুঁকিগুলো এড়িয়ে চলতে হবে। বাল্যবিবাহকে না। বেশি সন্তান নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। নজর দিতে হবে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার দিকে। কন্যাসন্তানের জন্য এইচপিভি টিকা। বড়দের জন্য ক্যানসার স্ক্রিনিং।
বিশেষ সময়ে পরিচ্ছন্ন পরিবেশঃ মাসের বিশেষ সময়টি একসময় ছিল বিব্রতকর, নানা বিড়ম্বনায় ভরা। স্কুল কামাই, কাজে বিরতি। পুরোনো ন্যাকড়ার অস্বাস্থ্যকর ব্যবহার। প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে জ্ঞানের অভাব। এখন অন্তত দু–একটা শ্রেণির নারীদের আর পুরোনো কাপড়ে নির্ভরতা নেই। স্কুল কামাই, কাজে বিরতির দরকার নেই। আধুনিক জীবাণুমুক্ত ন্যাপকিনে স্বাচ্ছন্দ্য আর স্বাস্থ্যকর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। কিন্তু এর জন্য যে আর্থিক সামর্থ্যটুকু চাই, সবার তা নেই। গ্রাম ও শহরের অগণিত দরিদ্র নারীর জন্য চাই অক্ষয়কুমাররূপী একজন ‘প্যাডম্যানের’।

এইচপিভি টিকা আছে, কে নেবেন? আপনি কিশোরী কন্যার জননী। এখন অনেকের জানা, এইচপিভির টিকা পাওয়া যাচ্ছে। কৌশলী বিজ্ঞাপন দেখে, কোনো চিকিৎসকের কাছে শুনে থাকবেন, এইচপিভি টিকা নিতে অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন। কিন্তু কার জন্য নেবেন? আমাদের পরামর্শ, আপনি নন, টিকা নেবেন আপনার কিশোরী মেয়ের জন্য। কারণ, এই টিকা নেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত বয়স ৯ থেকে ১৪ বছর। আমাদের দেশের বাস্তবতা অনুযায়ী বিয়ের আগে এই টিকা নেওয়া দরকার। কারণ, শারীরিক মেলামেশার মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। একবার সংক্রমণ হয়ে গেলে এই টিকার কার্যকারিতা থাকে না। তবে কিছু গবেষণায় ২৫ বছর পর্যন্ত টিকা দেওয়া যেতে পারে বলে মত এসেছে। কিন্তু পঁচিশের পর এই টিকা ক্যানসারে কোনো ভূমিকা রাখে না বললেই চলে।

কোথায় পাব, কেমন খরচ? দুটি কোম্পানি এই টিকা এনেছে। জিএসকে (গ্লাক্সো) এনেছে সারভারিক্স, যা কাজ করে এইচপিভি ১৬ ও ১৮–এর বিরুদ্ধে। দাম প্রতি ডোজ প্রায় আড়াই হাজার টাকা। হেলথকেয়ার এনেছে গার্ডেসিল। দাম একটু বেশি, প্রতি ডোজ প্রায় চার হাজার টাকা। ১৫ বছরের আগে দিলে ডোজ লাগে দুটি। ১৫ পেরিয়ে গেলে লাগবে তিন ডোজ।
এ তো গেল প্রাথমিক প্রতিরোধ। আক্রান্ত হলে সূচনায় ধরার জন্য আছে স্ত্রিনিং। লক্ষণপূর্ব অবস্থায় শনাক্তকরণ। আপাত সুস্থ, ক্যানসারের কোনো লক্ষণ নেই, তবে কোনো বিশেষ ক্যানসারের এক বা একাধিক ঝুঁকি আছে, এমন মানুষের ওপর কোনো সহজ পরীক্ষা বা পদ্ধতি প্রয়োগ করে গোপন থাকা ক্যানসার খুঁজে বের করার পদ্ধতি। এ নিয়ে আতঙ্কের বা ভয়ের কিছু নেই। কাটাছেঁড়া বা কষ্টদায়ক নয় এটি। জরায়ুমুখের ক্যানসারের প্রচলিত পদ্ধতি প্যাপ টেস্ট। আরও একটি সহজ পদ্ধতি ভায়া টেস্ট।

বাংলাদেশের নারীরা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন স্তন ক্যানসারে, এর পরেই জরায়ুমুখের ক্যানসারের স্থান। প্রতিবছর জরায়ুমুখের ক্যানসারে বাংলাদেশে ৮ হাজার ৬৮ জন আক্রান্ত হয়, মারা যায় ৫ হাজার ২১৪ জন। আর বিশ্বে প্রতিবছর এই রোগে আক্রান্ত হয় ৫ লাখ ৬৯ হাজার ৮৪৭ জন, মৃত্যু হয় ৩ লাখ ১১ হাজার ৩৬৫ জনের। ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসারের (আইএআরসি) অনুমিত হিসাব এটি।
আর্থসামাজিক ও ব্যক্তিগত ঝুঁকিঃ জরায়ুমুখের ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে আছে কিছু ঝুঁকি। আছে ব্যক্তিগত জীবনাচরণের বিষয়। বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক সমস্যা আছে। ঝুঁকি হিসেবে আরও আছে দারিদ্র্য, অপুষ্টি। আর আছে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব।
ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার। সহযোগী অধ্যাপক ও প্রধান, ক্যানসার ইপিডেমিওলজি বিভাগ, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা