হাজী ওয়াহেদ ম্যানশন – যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রসাধনী ব্র্যান্ড নাম ‘ক্লেরিস’। শিকাগো শহরের গ্রেসেøক ইলিনয়সভিত্তিক এ কোম্পানির অন্যতম পণ্য ডেইলি বেবি লোশন। যা উৎপাদন হয় থাইল্যান্ডে। বাংলাদেশের কোথাও এমনকি ভারতেও নেই প্রতিষ্ঠানটির কোনো কারখানা। কিন্তু চকবাজার চুড়িহাট্টার মৃত্যুপুরী সেই হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে ক্লেরিসের লোগো হুবহু নকল করেই তৈরি হতো ডেইলি বেবি লোশন।

একইভাবে দুবাইয়ের ‘স্টারলিং’ ব্র্যান্ডের নকল পারফিউমও তৈরি হতো ওই ভবনে। চারতলা এই ভবনে থাকা বডি ¯েপ্রর হাজার হাজার বোতলে থাকা দাহ্য পদার্থের কারণেই বুধবার রাতে নিমিষেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএসটিআইসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উদাসীনতার কারণেই বছরের পর বছর ধরে চকবাজারসহ আশপাশের এলাকায় এসব নকল প্রসাধনসামগ্রীর কারখানা গড়ে উঠেছে। এ কারখানাগুলোয় বডি ¯েপ্র ছাড়াও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক থাকে, যা মারাত্মক দাহ্য।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, আগুনের পর হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় এখন স্তূপ হয়ে জমে আছে এসব নকল পারফিউম ও লোশনের বোতল। যার সবই পুড়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রমের কারণে অনেক বোতল আবার পড়ে আছে সামনের রাস্তায়ও। এসব বোতলে একটু চোখ বুলালেই দেখা যাবে বিভিন্ন নামিদামি ব্র্যান্ডের হুবহু সিল।

এ বিষয়ে কনজ্যুমার অ্যাসোশিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) প্রেসিডেন্ট গোলাম রহমান বলেন, পুরান ঢাকায় অন্তত ৫০ বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাসায়নিক বা দাহ্য পদার্থের গোডাউন ও কারখানা রয়েছে। সরকারের উদ্যোগসহ আমরা সেগুলো সরিয়ে নিতে বললেও ব্যবসায়ীদের প্রতিবাদের মুখে তা হয়নি। পাশাপাশি বিখ্যাত ব্র্যান্ডের নকল পণ্য উৎপাদনের পেছনে যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা তারা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করছেন না। ভ্রাম্যমাণ আদালত থাকার পরও এটা হওয়ার কথা নয়।

পাশের ভবনের ছাদে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচেন ১৫ জন

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে আগুনের লেলিহান শিখা ৬৭ জনের প্রাণ কেড়ে নিলেও উপস্থিত বুদ্ধি খাটিয়ে বা ভাগ্যের জোরে বেঁচেও ফিরেছেন অনেকে। এমনই ১৫ জনের বেঁচে ফেরার কথা জানালেন চুড়িহাট্টার আনাস রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার রেজাউল হোসেন।

তিনি জানান, রাজমহল খাবার হোটেলের বিপরীতেই চারতলা ভবনের নিচে আনাস রেস্টুরেন্ট। দোতলায় রেস্টুরেন্টের অফিস। বুধবার রাত ১০টার দিকে তিনিসহ ১৫ জন বৈঠক করছিলেন। সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান। এ সময় বারান্দার গ্রিল দিয়ে তাকিয়ে দেখেন আগুন জ্বলছে চারদিকে।

রেজাউল জানান, আগুন দেখে তিনিসহ সবাই নিচতলায় নেমে আসেন। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখায় বের হতে পারেননি। পরে ভবনের ছাদে চলে যান সবাই। ভবনের অন্যান্য তলায় কারখানা ও কর্মচারীদের মেস। বিস্ফোরিত হয়ে পারফিউমের কৌটা ছিটকে পড়ে ছাদে। তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পাশের একটি ভবনের ছাদে লাফ দেন তারা। সেখান থেকে তারা নিচে নেমে প্রাণে রক্ষা পান।

তিনি বলেন, ‘এমন অগ্নিকাণ্ড এ জীবনে দেখিনি। যতক্ষণ না সেখান থেকে বের হতে পেরেছি, ততক্ষণ দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ভাবছিলাম বেঁচে ফিরবো কি-না।’

চুড়িহাট্টা মোড়ে শাহী মসজিদ এবং চুড়িহাট্টা ফোরকানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা। মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আহসান উল্লাহ ও মোফাজ্জল হোসেন অভিন্ন ভাষায় জানালেন, তারা পড়া শেষ করে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মাদ্রাসার চতুর্থ তলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় মসজিদে নামছিল। এ সময় হঠাৎ বিকট শব্দ শোনেন তারা। সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের জানালা দিয়ে বাইরে আগুন জ্বলতে দেখে। এরপরই তারা দ্রুত চারতলায় উঠে যান।

আলী আহাম্মদ নামে ওই এলাকার এক বাসিন্দা জানান, তিন-চার দিন ধরে ওয়াহেদ ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার গোডাউনে পারফিউম তোলা হচ্ছিল। গোডাউন ভর্তি পারফিউমে আগুন লেগে তা ছিটকে পড়ে পাশের মসজিদ, রাস্তাসহ আশপাশের ভবনে।

ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচতলার প্লাস্টিকের দানা ব্যবসায়ী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ১০ মিনিট আগে তিনি দোকান বন্ধ করে বাসায় যান। আগুনের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে এলেও দোকান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেননি। তার প্রায় ১০ লাখ টাকার মালপত্র পুড়ে গেছে বলে জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মসজিদের পাশে একটি পাচঁতলা ভবনে আগুন লাগে। পরে আগুন আশপাশের আরো তিনটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট প্রায় ৯ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এই অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৬৭ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং প্রায় অর্ধশত জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

Related Post