রিক্সা চালাতে গিয়ে – অভাব সংসারে স্বচ্ছলতা আনতে দশ বছর আগে নাটোরের সিংড়া উপজেলার হাতিয়ান্দহ ইউনিয়নের নতুনবস্তী পাটকান্দি গ্রামের সাইফুল ইসলাম গ্রাম ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজধানী ঢাকায়। সঙ্গে নিয়ে যান চাচাতো ভাই রতন আলীকে। রিক্সা চালিয়ে সংসার খরচ পাঠাতেন বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তানদের জন্য।

ঢাকার কামরাঙ্গীর চর এলাকার নুরুল হকের একটি গ্যারেজ থেকে রিক্সা ভাড়া নিয়ে চকবাজার এলাকায় তারা ভাড়া খাটতেন। বেশ ভালই কাটছিল দুই ভাইয়ের। কিন্তু সাইফুলের সুখের স্বপ্ন তছনছ করে দেয় বুধবার রাতের চকবাজর এলাকার অগ্নিকান্ড। সাইফুল ওই দিন রাতে চকবাজার এলাকায় ভাড়া খাটতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরা হয়নি সাইফুলের। রিক্সা সহ পুড়ে অঙ্গার হয় সাইফুলের দেহ। অন্যদের মত সাইফুলও আগুনে পুড়ে মারা যায়। মৃত্যুর খবর গ্রামে পৌঁছার পর চলছে শোকের মাতম।

নিহত সাইফুল ওই গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে। শুক্রবার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভোর রাতে সাইফুলের মৃতদেহ গ্রামে পৌঁছিলে গোটা গ্রাম জুরে শুরু হয় কান্নার রোল। এসময় গ্রাম জুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে। বাতাস ভারি হয়ে ওঠে। সাইফুলকে দেখতে আসা ভিন গ্রামের মানুষও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

এলাকাবাসী ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগ থেকে লাশ শনাক্ত করা হয়।

নিহত সাইফুল ইসলামের চাচাতো ভাই রতন আলী বলেন, তারা প্রায় ১০ বছর ধরে তারা চকবাজার এলাকায় রিক্সা চালান। বুধবার রাতের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় তার ভাই সাইফুল ইসলাম নিখোঁজ হলে বৃহস্পতিবার শাহি মসজিদের সামনে একটি ধ্বংসস্তুপে রিক্সা দেখে সাইফুলের নিহতের বিষয়ে নিশ্চিত হন। পরে রাত ১১টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগে লাশের গলায় চান্দির মালা দেখে লাশ শনাক্ত করেন।
এদিকে শুক্রবার ভোর রাতে নিহত সাইফুলের লাশ তার গ্রামের বাড়ি নতুনবস্তী পাটকান্দি গ্রামে আনা হয়। পরে সকাল ১০টায় জানাজা নামায শেষে স্থানীয় কবরন্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।

সিংড়া থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার (ওসি) মনিরুল ইসলাম নিহত সাইফুলের লাশ দাফনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এলাকায় নিহতদের পরিবারের খবর নেওয়া হয়েছে। এছাড়া শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।

সিংড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুশান্ত কুমার মাহাতো বলেন, বিষয়টি তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে জেনেছেন। এবিষয়ে খোঁজ নিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

জেলা প্রশাসক মোহম্মদ শাহরিয়াজ বলেন, তিনি রাষ্ট্রীয় অন্য একটি কাজে জেলা শহরের বাহিরে অবস্থান করায় জানাজা নামাযে শরীক হতে পারেনননি। তবে সার্বক্ষণিক খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তাদের সব ধরনের সহায়তা করার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শোকাহত পরিবারকে সমবেদনা জানাতে ওই গ্রামে যাবেন তিনি।

ছেলের ছবি হাতে ডিএনএ নমুনা দিতে ঢামেকে মা

রাজধানীর পুরান ঢকায় চকবাজারে আগুনে পুড়ে ছেলের চেহারা বিকৃত হয়ে পড়ায় লাশ শনাক্ত করা যাচ্ছে না। বোনের বিয়ের কেনাকাটা করতে গিয়ে লাশ হওয়া নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহানে

ছেলের ছবি হাতে রোহানের মা ডিএনএর নমুনা দিতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন ছেলের লাশ নিতে।

শুক্রবার (২২ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টার কিছু সময় পর তিনি ঢাকা মেডিকেলে আসেন।

এদিকে বেলা ১১টা থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে লাশের সন্ধানে আসা স্বজনদের ডিএনএ পরীক্ষা শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন টিম। এর অংশ হিসেবে স্বজনদের রক্তের নমুনা নেয়া হচ্ছে।

সিআইডির সহকারী ডিএনএ অ্যানালিস্ট নুসরাত ইয়াসমিন গণামাধ্যমকে জানান, ৪৫ জনের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। বাকি ২২ জনের লাশ শনাক্ত করতে বেশ সময় লাগতে পারে।

তিনি জানান, যারা লাশের সন্ধানের জন্য এসেছেন তাদের বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তানদের রক্তের নমুনা রাখা হবে। যদি তারা না আসেন, তা হলে ভাইবোনদের নমুনা রাখা হবে। তবে পুরো বিষয়টির জন্য সময় লাগবে ৭ থেকে ২১ দিন।

চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডে নিহত রোহান বিয়ের কেনাকাটা করতে চার বন্ধুকে নিয়ে বের হয়েছিলেন। আরও কিছু কাজও ছিল তার। সব শেষ করে বাসায় ফেরার কথা ছিল।

কিন্তু বুধবার রাতে পুরান ঢাকার চকবাজারের অগ্নিকাণ্ড সেই উৎসব থেকে নাই হয়ে গেলেন রোহান। থামিয়ে দিল তার সব আনন্দ ও উৎসব। আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না রাজধানীর নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী রোহান।

রোহানের সঙ্গে ছিলেন উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ‘এ’ লেভেলের ছাত্র আরাফাত। আগুনের লেলিহান শিখা গ্রাস করলে লাশ হলেন তিনিও। কাজী আলাউদ্দিন রোডসংলগ্ন মসজিদ এলাকার বাসিন্দা আরাফাত।

রোহানের চাচাতো ভাই মমিন জানান, রোহানের মরদেহ মর্গে আছে বলে নিশ্চিত হলেও কেউ শনাক্ত করতে পারছি না।

অপর একটি মোটরসাইকেলে রোহানের সঙ্গে ছিলেন তার ভাগ্নে লাবিব, রমিজ ও সোহাগ।

লাবিবের মাথার সামান্য অংশ পুড়লেও তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন। রোহানের নানা ইউনুস খান জানান, রোহানের ছোট বোনের বিয়ে আগামী মার্চে। আর তাই বন্ধুদের নিয়ে সে খুব ব্যস্ততার ভেতর ছিল। বুধবার সে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া ও ডেকোরেশনে কথা বলতে গিয়েছিল। কিছু কেনাকাটার কাজও বাকি ছিল, তখন এ দুর্ঘটনা ঘটে।

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় একটি আবাসিক ভবনে ভয়াবহ এ অগ্নিকাণ্ডের সময় রাস্তায় যানজটে আটকে থাকায় অনেকে প্রাণে রক্ষা পাননি। আগুনের কবল থেকে পালিয়ে বাঁচার আগেই মৃত্যু তাদের গ্রাস করে নিয়েছে।

উল্লেখ্য, রাজধানীর চকবাজার এলাকার নন্দকুমার দত্ত সড়কের চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের পেছনের একটি ভবনে বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে আগুন লাগে। এ ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত হন। আহত হয়েছেন ৪১ জন।

Related Post

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •