আমাদের ব্যক্তি-জীবনে ও সমাজ-জীবনে বিভিন্ন ঘটনা ঘটে, বিভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়। সকল অবস্থায় মুমিনের কর্তব্য আল্লাহ-অভিমুখী থাকা। মুমিনের অটল ঈমান- পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে আল্লাহর জ্ঞাতসারেই ঘটে, তাঁর আদেশের বাইরে কিছুই ঘটে না। পরিস্থিতি ও তার করণীয় সম্পর্কে সঠিক উপলব্ধির জন্য এই ঈমানী চেতনা জাগরূক থাকা অতি প্রয়োজন।
ব্যক্তি-জীবন ও সমাজ-জীবনে সব বিষয় বাঞ্ছিত ও প্রীতিকর হয় না। কিছু বিষয় বাঞ্ছিত হয়, কিছু অবাঞ্ছিত। কিছু বিষয় প্রীতিকর হয়, কিছু অপ্রীতিকর। এ ব্যাপারটা সবার জীবনে ঘটে, সব সমাজে ঘটে। তবে মুমিনের বিশিষ্টতা হচ্ছে, মুমিন ঘটে যাওয়া বিষয়াদিকে নিছক ঘটনাচক্র মনে করে না। মুমিনের বিশ্বাস, এইসকল ঘটনার পিছনে কার্যকর মহান রাব্বুল আলামীনের ইচ্ছা। ফলে কাম্য ও বাঞ্ছিত বিষয়াদির ক্ষেত্রে মুমিন আল্লাহর শোকরগোযারি করে, অকাম্য-অবাঞ্ছিত বিষয়াদিতে সবর করে। এই সবর ও শোকরের ফলে মুমিন-জীবনের সুখ-দুঃখ তার জন্য কল্যাণকর হয়।

ঘটনাবলির আরেক করণীয় হচ্ছে, চিন্তা-ভাবনা ও শিক্ষাগ্রহণ। ব্যক্তি ও সমাজে দুঃখ-দুর্দশার বিস্তার ঘটলে শুধু হা-হুতাশ কাম্য নয়। কাম্য হচ্ছে, ব্যক্তিগত ও সামাজিক কাজ-কর্মের বিচার-বিশ্লেষণ। কারণ, ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির ক্ষেত্রে মানুষের কর্মেরও অনেক বড় প্রভাব থাকে। মানুষের ভালো কাজ ভালো পরিণামের কারণ হয়, মন্দ কাজ মন্দ পরিণামের। কাজেই ভালো বা মন্দ পরিস্থিতির মুখোমুখী হলে শুধু পরিস্থিতির আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশে সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের কর্ম ও আচরণের দিকে গভীর পর্যবেক্ষণী দৃষ্টি দেয়া অবশ্যকর্তব্য।
কুরআন মাজীদের বাণী-
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِی الْبَرِّ وَ الْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ اَیْدِی النَّاسِ لِیُذِیْقَهُمْ بَعْضَ الَّذِیْ عَمِلُوْا لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْن.
মানুষের কৃতকর্মের দরুন জলে-স্থলে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; যার ফলে তাদেরকে তাদের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে। -সূরা রূম (৩০) : ৪১
পৃথিবীতে যা কিছু অশান্তি- খুন, ধর্ষণ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অতৃপ্তি, ঝগড়া-বিবাদ, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভয়-ভীতি, নিরাপত্তাহীনতা, অবক্ষয়, দুর্নীতি, অনাচার, এই সবকিছুই মানুষের কর্ম ও কর্মফল। মানুষ তার কর্মের দ্বারা নিজেকে, নিজের পরিবারকে এবং নিজের সমাজ ও রাষ্ট্রকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এই কর্মেরই ফলস্বরূপ পতিত হয় অশান্তিতে। কাজেই ব্যক্তি ও সমাজের সুখ-শান্তির জন্য মানুষের নিজের কর্মের বিচারের কোনো বিকল্প নেই। যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে প্রয়োজন মুহাসাবা ও আত্মসমালোচনা। ব্যক্তি থেকে সমাজ সকল পর্যায়ে আত্ম-সমালোচনার চর্চা প্রয়োজন।
মানুষ যখন ব্যাধি চিহ্নিত করে ও তা স্বীকার করে তখনই তার সুচিকিৎসার উপায় হয়।
সমাজের সমস্যাগুলোকে সমস্যা হিসেবে উপলব্ধির পর তা থেকে উত্তরণের জন্য যেমন সংকল্প প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন আল্লাহ তাআলার দরবারে দুআ ও মুনাজাত। মানুষের সকল কর্মপ্রচেষ্টা তখনই সফল হয় যখন আল্লাহ তা সফল করেন। কাজেই কর্ম-প্রচেষ্টার সাথে আল্লাহ অভিমুখিতার কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের কর্তব্য, নিজের জন্যও দুআ করা, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্যও দুআ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের দুনিয়া-আখিরাত উভয় জাহানের শান্তি ও কল্যাণের প্রার্থনা করতে শিখিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবার প্রতি কল্যাণকামী হওয়ার শিক্ষা দান করেছেন। কাজেই আমরা যেমন নিজের জন্য এই দুআ করতে পারি-
اَللّٰهُمّ أَصْلِحْ لِيْ دِيْنِيْ، الّذِيْ هُوَ عِصْمَةُ أَمْرِيْ، وَأَصْلِحْ لِيْ دُنْيَايَ، الّتِيْ فِيهَا مَعَاشِيْ، وَأَصْلِحْ لِيْ آخِرَتِيْ، الّتِيْ فِيهَا مَعَادِيْ، وَاجْعَلِ الْحَيَاةَ زِيَادَةً لِيْ فِيْ كُلِّ خَيْرٍ، وَاجْعَلِ الْمَوْتَ رَاحَةً لِيْ مِنْ كُلِّ شَرٍّ.
আয় আল্লাহ! আমার দ্বীনদারি দুরস্ত করুন, যা আমার সকল বিষয়ের রক্ষাকবচ। আমার দুনিয়া দুরস্ত করে দিন, যাতে আমার জীবন যাপন আর আমার আখিরাত দুরস্ত করে দিন, যাতে আমার প্রত্যাবর্তন। আমার জীবনকে করুন প্রত্যেক কল্যাণের পথে অগ্রসরতা আর মৃত্যুকে করুন সকল অনিষ্ট থেকে মুক্তি।
তেমনি দেশ ও দেশবাসীর জন্য এই প্রার্থনা করতে পারি-
اللهُمّ ضَعْ فِي أَرْضِنَا بَرَكَتَهَا وَزِينَتَهَا وَسَكَنَهَا.
ইয়া আল্লাহ! আমাদের মাটিতে প্রাচুর্য দিন, শোভা ও শ্যামলিমা দিন, শান্তি ও নিরাপত্তা দিন।
সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্ণধরদের জন্যও দুআ করতে পারি-
اللهُمّ أَصْلِحْ ولاة أمورنا وارزقهم البطانة الصالحة واجعل ولايتنا فيمن خافك واتقاك.
আয় আল্লাহ! আমাদের দায়িত্বশীলদের সংশোধন করুন এবং তাদেরকে ভালো পরামর্শক নসীব করুন। আর আমাদের অভিভাবকত্ব তাদেরই দান করুন যারা আপনাকে ভয় করে, আপনার নাফরমানী থেকে বেঁচে থাকে।
আল্লাহর দরবারে দুআ ও মুনাজাত এবং নিজের ও সংশ্লিষ্টদের কর্মের সংশোধনের পাশাপাশি আমরা যদি আমাদের ঈমানী ও দাওয়াতী যিম্মাদারি পালন করতে থাকি তাহলে ইনশাআল্লাহ পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন হতে থাকবে।
মুমিন যদি পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন দেখে যেতে না-ও পারে এতে দুঃখ ও হতাশার কিছু নেই। মুমিনের মূল লক্ষ্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতা মুক্ত হওয়া। এটা পরিস্থিতির পরিবতর্নের সাথে যুক্ত নয়, যুক্ত নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পন্ন করার সাথে।
কাজেই সে-ই সফল, যে তার দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনে সক্ষম হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দান করুন।

Related Post

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •