পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমারন খান পাক-ভারত চলমান যুদ্ধাবস্থা নিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। আজ বুধবার সকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক ভারতের দুটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত ও ভারতীয় ভূখন্ডে বোমা নিক্ষেপের পর বিকালে ৬ মিনিটের সংক্ষিপ্ত এই ভাষণে ইমরান খান ভারতকে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানিয়েছেন।

ভাষণের শুরুতে পাক প্রধানমন্ত্রী তার দেশের জনগণের উদ্দেশে বলেন, ‘গতকাল সকাল থেকে ঘটা ঘটনা প্রবাহের প্রেক্ষিতে আমি জাতিকে আত্মবিশ্বাস জোগাতে চেয়েছি। পুলওয়ামার ঘটনার পর আমরা ভারতকে শান্তির প্রস্তাব দিয়েছিলাম। ওই হামলায় যারা স্বজন হারিয়েছেন সেসব পরিবারের কষ্ট আমি অনুভব করেছি।

ঘটনার হাসপাতালে গিয়ে ভিকটিমদের কষ্ট দেখেছি। আমরা ভারতকে বলেছিলাম ঘটনার তদন্ত করবো। তাদেরকে সহায়তা করতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আশঙ্কা করেছিলাম ভারত আগ্রাসন চালাতে পারে। এজন্য তাদেরকে হুশিয়ার করেছিলাম। কাল যখন ভারত হামলা করলো, প্রথমে আমাদের আর্মি কর্তৃপক্ষকে ডেকে ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করতে বলেছিলাম।

এরপর আমরা ততটুকুই করেছি যতটুকুর মাধ্যমে এই বার্তা দেয়া যায় যে, আপনারা যদি আমাদের দেশে প্রবেশ করেন, তাহলে আমারও একই কাজ করবো। তাদের দুটি মিগ ভূপাতিত করা হয়েছে। এখন সময় এসেছে মাথাকে কাজে লাগিয়ে প্রজ্ঞার সাথে আচরণ করা।”

ইমরান খান আরও বলেন, ‘সব যুদ্ধই ভুল হিসেব নিকেশের মাধ্যমে শুরু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ হয়েছিল ছয় বছর পর।

একইভাবে কেউ ধারণা করেনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ১৭ বছর লেগে যাবে। আমি ভারতের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, আপনাদের হাতে যেসব অস্ত্র আছে আমাদের হাতেও সেগুলো আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো আমরা উভয়ে কি কোনো ভুল হিসেবে নিকেশের মাশুল বইতে পারবো?

যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়, তাহলে তা আমার কিম্বা মোদির কারো নিয়ন্ত্রণেই থাকবে না। পুলওয়ামা হামলার ভুক্তভোগীদের কষ্ট আমরা অনুধাবন করি এবং এ বিষয়ে তদন্ত ও সংলাপের জন্য আামরা প্রস্তুত। চলুন এক সঙ্গে টেবিলে বসি এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাটার সমাধান করি।’

পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা আর বাড়াতে চায় না ভারত : সুষমা

ভারত জানিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতির আর অবনতি দেখতে চায় না তারা। দায়িত্ব ও সংযমের সঙ্গে দুদেশের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চায় ভারত। খবর ইউএনবি’র।

পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভারতের মর্টার শেলের আঘাতে ছয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে বলে পাকিস্তানের পুলিশ জানানোর পরপরই ভারতের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য দেয়া হয়।

বুধবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ভারতে আবার হামলার প্রতিরোধের জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ হিসেবে মঙ্গলবার পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সীমিত আকারে আক্রমণ চালানো হয়েছে।

চীনের হুয়েনে রাশিয়া, ভারত ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ১৬তম বৈঠকে সুষমা এ কথা বলেন।

এর আগে পাকিস্তানের স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাফ জানান, কাশ্মীরে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কোতলি গ্রামে ভারতের হামলায় শিশুসহ অন্তত ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। পাকিস্তান ও ভারত উভয়ই এলাকাটিকে নিজেদের অংশ হিসেবে দাবি করেছে।

ভারতীয় বিমান আকাশসীমা লঙ্ঘন করে পাকিস্তানে প্রবেশ করে বোমা হামলা চালিয়েছে বলে মঙ্গলবার পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র টু্ইট করেন। তবে এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করেন ওই মুখপাত্র।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামায় এক আত্মঘাতী হামলায় ভারতের আধা সামরিক বাহিনীর ৪০ জনের বেশি সদস্য নিহত হন। পাকিস্তান-ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মোহাম্মদ হামলার দায় স্বীকার করে।

এরপর প্রতিবেশী দুদেশের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে।

ভারত এই হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে প্রতিশোধ নেয়ার হুমকি দিতে থাকে। তবে পুলওয়ামা হামলায় পাকিস্তানের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ভারত তাদের ওপর হামলা করলে পাকিস্তানও পাল্টা জবাব দেবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

প্রসঙ্গত, ১৯৪৭ সালে বৃটিশ শাসনমুক্ত হওয়ার পর থেকেই অমীমাংসিত কাশ্মীর রাজ্য নিয়ে পারমাণবিক ক্ষমতাধর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। পাকিস্তানের অধীনে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে কাশ্মীরকে চায় এক গোষ্ঠী। অন্যদিকে ভারতের অধীনে কাশ্মীরকে চায় আরেক গোষ্ঠী।

পরমাণু অস্ত্রের বিষয়ে জরুরী বৈঠকে বসছে পাকিস্তান

কাশ্মীরে পুলওয়ামায় ভয়াবহ আত্মঘাতী হামলায় ৪৪ সিআরপিএফ সদস্যের মৃত্যুর পর মঙ্গলবার(২৬ ফেব্রুয়ারি) ভোরে পাকিস্তানে ঢুকে হামলা চালিয়েছে ভারত। এরপর বৈঠকে বসেছিল পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ।

সেখান থেকে দিল্লিকে হুমকি দিকে ইসলামাবাদ বলেছে, নিজেদের সময় মতো ভারতকে ‘সারপ্রাইজ’ দেবে। এরই মধ্যে আজ বুধবার ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির বৈঠক ডেকেছে পাকিস্তান। এই কমিটি আসলে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্র সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করে।

এনডিটিভির খবর, পাকিস্তান ভারতীয় বিমান বাহিনীর হামলার কথা অস্বীকার করলেও দেশটি বলছে, ভারত যা করেছে তার জবাব দেওয়া হবে। শুধু তাই নয় গোটা বিষয়টি জাতিসংঘে জানাবে পাকিস্তান। সাংবাদিকদের পাকিস্তানি সেনার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, আমরা ভারতকে চমকে দেব। তাঁর কথাতেই স্পষ্ট হয়েছে, এই চমকে দেওয়ার ব্যাপারটা সামরিক এবং রাজনৈতিক- দু’ভাবেই হবে।

এরই মাঝে আজ বুধবার পরমাণু অস্ত্র নিয়ে জরুরী বৈঠকে বসছে পাকিস্তান। তাছাড়া আজই পাক সংসদের যৌথ অধিবেশন ডাকা হয়েছে। তবে পাকিস্তানের এই বৈঠককে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবেই দেখছে দিল্লির প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ মহলের একটা বড় অংশ। দেশের এক প্রাক্তন আমলা ভারতীয় এই গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি মনে করেন পাকিস্তানের কাছে আর কোনও উপায় না থাকাতেই এই বৈঠক ডাকা হয়েছে।

অন্যদিকে, এর আগেই পাকিস্তানের পরমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন খোদ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি পারভেজ মুশারফ। তিনি বলেন, একটি পরমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করলে পাল্টা একই ধরনের ২০টি বোমার সাহায্যে পাকিস্তানকেই ধ্বংস করে দিতে পারে ভারত।

দৈনিক ডন সংবাদপত্র জানিয়েছে, গত শুক্রবার আবুধাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে মোশাররফ জানান, ভারত এবং পাকিস্তানের সম্পর্ক আবার বিপদজনক জায়গায় পৌঁছে গেছে। কোনো পারমাণবিক আক্রমণ হবে না।

আমরা (পাকিস্তান) যদি ভারতকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমণ করি তাহলে পাল্টা একই ধরনের ২০টি বোমার সাহায্যে পাকিস্তানকেই ধ্বংস করে দিতে পারে ভারত। তবে তিনি একথাও বলেছেন, পাকিস্তানের উচিত ৫০টি বোমা নিয়ে হামলা করা। সেটা করলে ভারত ২০টি বোমা নিয়ে হামলা করতে পারবে না। পাকিস্তান কি ৫০টি বোমা নিয়ে হামলা করতে প্রস্তুত?