প্রিয়নবী (সা.) অসংখ্য হাদিসে আমানতদারির মহৎ গুণকে ঈমানের আলামত বলেছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘যার আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই, আর যে ওয়াদা পালন করে না তার মধ্যে দ্বীন নেই।’ (বায়হাকি)
আরবি ‘আমানত’ শব্দের অর্থ গচ্ছিত রাখা, নিরাপদ রাখা। পরিভাষায়Ñ কারও কাছে কোনো অর্থসম্পদ, বস্তু, সামগ্রী গচ্ছিত রাখাকে আমানত বলা হয়। যিনি গচ্ছিত বস্তুকে বিশ্বস্ততার সঙ্গে সংরক্ষণ করেন, যথাযথভাবে হেফাজত করেন এবং মালিক চাওয়া মাত্রই কোনো টালবাহানা ছাড়া ফেরত দেন তাকে আল-আমিন তথা বিশ্বস্ত সত্যবাদী আমানতদার বলা হয়। আমানতের প্রচলন জীবনের সর্ব ক্ষেত্রেই দেখা যায়। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিটি স্তরে প্রতিটি বিষয়ে আমানত রক্ষা করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। লেনদেনের আমানত, কথার আমানতÑ যেসব বিষয় প্রকাশিত হলে বা যেসব কথা বললে পারস্পরিক সম্পর্ক অবনতি ঘটবে, মনোমালিন্য ও সংঘাত সৃষ্টি হবে, এমন বিষয় প্রকাশ না করা এবং না বলাও আমানত। সর্বক্ষেত্রে আমানত রক্ষা করা একজন মোমিনের পবিত্র দায়িত্ব ও কর্তব্য।
আমানতদারিকে আল্লাহ তায়ালা মোমিনের অন্যতম গুণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘এরা সেই লোক, যারা আমানতের প্রতি লক্ষ রাখে এবং স্বীয় অঙ্গীকার হেফাজত করে।’ (সূরা মোমিনুন : ৮)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন, তোমরা যেন আমানত তার মালিককে যথাযথভাবে প্রত্যর্পণ করো।’ (সূরা নিসা : ৫৮)।
প্রিয়নবী (সা.) অসংখ্য হাদিসে আমানতদারির মহৎ গুণকে ঈমানের আলামত বলেছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘যার আমানতদারি নেই তার ঈমান নেই, আর যে ওয়াদা পালন করে না তার মধ্যে দ্বীন নেই।’ (বায়হাকি)। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিশ্বস্ততা ও আমানতদারি রক্ষা না করা, অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, কথায় কথায় মিথ্যাচার করা ইত্যাদি গর্হিত আচরণকে মোনাফেকির নিদর্শন বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে। হাদিসে এরশাদ হয়েছে, ‘মোনাফেকের নিদর্শন তিনটি। কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে, যখন তার কাছে কোনো বস্তু আমানত রাখা হয়, তা খেয়ানত করে।’ (বোখারি)। এ হাদিস শরিফ থেকে বোঝা যায়, যারা মোনাফেক প্রকৃতির লোক, তারা আমানত রক্ষা করার প্রতি যতœশীল থাকে না। হকদারের প্রাপ্য হক তাকে প্রত্যর্পণ করে না। হয় নিজে আত্মসাৎ করে অথবা অপব্যবহারের মাধ্যমে তা নষ্ট করে।
হকদারের প্রাপ্য হকও আমানতের অন্তর্ভুক্ত। কাজেই পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী হকদারের যে কোনো হক আমাদের ওপর রয়েছে, তা আদায় করা আমাদের জন্য অপরিহার্য। এসব হকের মধ্যে রয়েছে আল্লাহর হক, বান্দার হক। বান্দার হকগুলোর মধ্যে আবার কিছু আছে দ্বীনসংক্রান্ত। আর কিছু দুনিয়াবি বিষয়ক। কিছু আত্মীয়স্বজন সম্পর্কিত। কিছু অন্যদের সঙ্গে জড়িত। আবার কিছু আছে বড়দের হক। কিছু ছোটদের এবং কিছু সমকক্ষদের হক।
এসব হক সম্পর্কে আমাদের অনেকের অবগতি না থাকার কারণে অথবা অমনোযোগিতা ও উদাসীনতার কারণে অনেকে এসব হক আদায়ের প্রতি যথাযথ যতœশীল থাকে না। ফলে আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অমান্য করার কারণে পরকালে তো তার শাস্তির সম্মুখীন হতেই হবে, এছাড়াও দুনিয়াতেও নানারকম জটিলতা ও সমস্যা, ফেতনা-ফ্যাসাদ, অরাজকতা-অশান্তি প্রতিনিয়ত সৃষ্টি হচ্ছে এবং হতেই থাকবে। তাই এসব হকের ব্যাপারে সচেতন হওয়া ও হক আদায়ে যত্নশীল হওয়ার জন্য এ সম্পর্কে অবগতি লাভ করা সবার জন্য আবশ্যক।