২০৬৬ সাল.
বয়স প্রায় ৭০ বছর. অনেক বৃদ্ধ হয়ে গেছি.চোখে ঠিকমত দেখিনা. চশমা না থাকলে কাছে থেকে দেখলে চিনতেও পারিনা তেমন. লাঠিটায় ভর দিয়ে চশমাটা ঠিক করে নাতির রুমে ঢুকলাম.. দেখলাম নাতি ফেসবুক চালাচ্ছে.. বললো নানু এসেছো…আচ্ছা তুমি থাকো…আমি
বাইরে থেকে আসছি একটু পর. ল্যাপটপে নাতির ফেসবুক দেখে মনে পড়ে গেলো সেই কবে থেকে আর ফেসবুকে ঢোকা হয়নি…জীবনের চরম পরিহাসে ফেসবুক নামক জিনিসটা হারিয়েই গেছিলো প্রায়.

অনেকদিন পর আজ নাতির ল্যাপটপ থেকে ফেসবুকে লগইন করতে ইচ্ছা হচ্ছে. বাট কেনো জানি পাসওয়ার্ডটা মনে করতে পারছি না. অনেককষ্টে পাসওয়ার্ড টা মনে হলো…মনে হলো প্রিয়তমার নামে পাসওয়ার্ডটা দেওয়া ছিল. ফেসবুক আছে…পাসওয়ার্ড টা আছে কিন্ত মানুষটা আমায় ছেড়ে চলে গেছে সেই কবে না ফেরার দেশে.. রেখে গেছে দুইটা সন্তান.. লগ ইন করলাম….দেখলাম নাতির বয়সের অনেকেই রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছে.. আবার ম্যাসেজ ও দিছে… রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট প্লিজ…সব পোস্টে লাইক দিই…৩জি লাইকার,কমেন্টার এ ধরনের কিছু ম্যাসেজ. আপনি আর লেখেন না কেন? আপনার লেখা খুব মিস করি…ম্যাসেজগুলো অনেক আগের…যখন আমার বয়স ছিল ২৫-২৬. আর এখন ৭০.
ফ্রেন্ডলিস্টে ঢুকে দেখি প্রায় ৩০০০ ফ্রেন্ড…এই ফ্রেন্ডগুলো বানাতে প্রায় ৪ বছর লেগেছিল….আর এখনকার ছেলেমেয়েগুলো ১০-১২ দিনেই ৫০০০ ফ্রেন্ড বানিয়ে ফেলে.. ফ্রেন্ডলিস্টে ৩০০০ ফ্রেন্ড থাকলেও চ্যাটে ছিল মাত্র ১২ জন…একটাও পরিচিত না!!

তারপর ফ্রেন্ড লিস্টে ঢুকলাম. একে একে দেখা শুরু করলাম.. ক্যাম্পাসে যেই ছেলেটা বেস্ট ফ্রেন্ড ছিল ওর আইডি তে ঢুকলাম…দেখলাম
অনেকদিন লগ ইন করেনা…জীবনের ব্যাস্ততায় আমিও আর খোজ নিতে পারিনি.. পরে খোজ নিয়ে জানলাম ও মারা গেছে অনেকক আগেই…পড়ে আছে ওর ফেসবুক আইডিটা স্বযত্নে. যেই বন্ধুটা ফেসবুক সেলিব্রেটি মত ছিল তার লাস্ট পোস্টেই দেখলাম ৪০০০ এর মত
লাইক….লাস্ট পোস্ট ছিল এরকম…Hi Guys Panjabi te amai kmn lagse?? Kal amr biye…invite roilo tmader….শুনলাম শেষ পযন্ত আর বিয়েটা হয়নি…পথিমধ্যেই রোড এক্সিডেন্টে মারা গেছে..
চোখ দিয়ে পানি বাহির হয়ে গেল সেই মেয়েটার আইডি দেখে…ক্লাসের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা….সবার হ্রদয়কে তালমাতাল করে দেওয়া মেয়েটা আজ নিজেই তালমাতাল…দেখলাম লগ ইন করেনি বহু বছর… পাগল হয়ে গেছে মেয়েটা.
যেই বন্ধুটা সারাদিন পেজ নিয়ে পড়ে থাকতো…তার পেজে আজ অনেক লাইক কিন্তু বন্ধুটা নেই. ব্লাড ক্যান্সারে মারা গেছে অনেক আগেই..
যেই ছেলেটা সারাদিন ইউটিউবে সাবস্ক্রাইব বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করতো সে আজ মালিবাগ মৌচাকে ভিক্ষা করে..
রুমমেটটার আইডি দেখেই মনে হল…অনেক বড় বিজনেসম্যান হতে চেয়েছিল.. কিন্তু হায়রে জীবন!! তাকে সময় নিয়ে গেছে পরকালের বিজনেসে…
যে মেয়েটা সারাদিন ফেসবুক চালাতো সে আজ ফেসবুকেই আসসতে পারেনা সে প্যারালাইজড…. কিন্তু ফ্রেন্ড লিস্টে
আইডিটা চকমক করছে..
যেই বান্ধবীকে সারাদিন জ্বালাতাম সেই মেয়েটা তার নাতি নাতনীকে নিয়ে ব্যাস্ত.. ফেসবুকে আসার সময়ই পায় না.
সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক ফ্রেন্ডটার লাস্ট পোস্টে এখনো কমেন্ট পড়ছে বাট রিপ্লাই দেওয়ার মত কেউ নাই. শুনেছি ভালবাসার মানুষকে না পেয়ে আত্নহত্যা করেছিল..
আমার জীবনসঙ্গিনীর আইডি টিও চোখে পড়লো.বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে মানুষটার সাথে পরিচয়. মনে পড়লো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারিস রোড..টুকিটাকি… জোহা চত্বর…মানুষটাকে নিয়ে কত হেটেছি প্যারিস রোডে…ফ্রে্ন্ডদের কত ট্রিট দিতে হয়েছে…সারা ক্যাম্পাসে কত ঘোরাঘুরি…. মনে পড়ছিল সেই সোনালী দিনগুলো….তৃতীয় বিজ্ঞান ভবন….পরিবহন মার্কেট…শহীদ মিনার….কত কি!!আজ সবই
আছে এগুলোর….শুধু মানুষটা নেই. কত অনুষ্টানের মধ্যদিয়ে আমাদের বিয়ে হয়েছিল…কত আনন্দ উৎসব…কত ঘোরাঘুরি….আমাদের ঘর আলো করে দিয়ে দুইটি সন্তান এলো…প্রথম সন্তান মেয়ে দ্বিতীয় সন্তান ছেলে..

কিছুকাল পরেই কি যেনো এক দমকা হাওয়ায় সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে সারাজীবনের সঙ্গীটা আমায় ছেড়ে চলে গেল না ফেরা দেশে…..খুব কষ্ট পেয়েছিলাম….বিশ্ববিদ্যালয় লাইফ থেকে মানুষটা সবসময় পাশে থেকেছে…আজ সেই মানুষটা কিনা আমায় একা করে দিয়ে চলে গেল.. খেয়েছো কিনা..কেনো খাওনি…ঔষুধ কেনো খাওনি…কতবার বলেছি সময়মত ঔষুধ খেতে হবে….এগুলো আর কেউ বলবে না…কেউ বলবে না ওযুর পানি এনে দিই নামায পড়তে হবে…কেউ বলবে না দিনদিন এত শুকিয়ে যাচ্ছো কেন….মানুষটা বারবার বলতো আর বারবার অভিমান করতো. আমি না খেয়ে থাকলে যেই মানুষটা আচল থেকে মুড়ানো ২০ টাকার নোট দিয়ে বলতো এটা ডিম বেচে পেয়েছি তুমি খেয়ে এসো আমার পেট ভরা….সেই মানুষটা আমি না খেলেও আজ বলবে না খেয়ে আসো..

জানেন যুবক কালে ফজরের নামায় পড়তে উঠতাম না….কিন্তু মানুষটা জীবনে আসার পর পরিবর্তন করে দিয়েছে….এখন নিজেই চশমটা পরে…লাঠি টা খুজে নিজেই ওযু করে নামায পড়ি…ওযুর পানি এনে দেওয়া মানুষটা যে আমার হারিয়ে গেছে..
ছেলেটা আজ অনেক বড় ব্যাবসায়ী সবকিছু আছে তার…অনেক টাকাপয়সা….ওর মা ছেলেটাকে খুব ভালবাসতো….কিন্তু মার অসুখের সময় কত করে বললাম বাবা কিছু টাকা দে…ছেলেটা ফিরেও তাকায়নি….পাগলিটা বলেছিল…ওগো আমার কিছু হয়নি…ওদের টাকা দরকার আছে…চেয়ো না….
ছেলেটা বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসতে চেয়েছিলো…কিন্তু মেয়েটা তা হতে দেয়নি…আমি আজ মেয়ের বাড়িতে.. এসব কথা মনে পড়ে হাউমাউ করে কান্না আসলো দাড়ি ভিজে পানি পড়ছে… পাগলিটা থাকলে জড়িয়ে ধরে বকা দিত কেন বাচ্চাদের মত কান্না কর..

সবকিছু ভেবে লগআউট করলাম…হয়ত এটাই জীবনের শেষ স্ট্যাটাস. (ফিরে যাও তোমার রবের দিকে… নিশ্চয় তার কথাতেই কল্যাণ নিহিত রয়েছে…) — feeling স্মৃতি.

Related Post