যে মুহূর্তে মার্কিন কর্তৃপক্ষ ও তালেবানের মধ্যে কাতারের দোহায় আলোচনা চলছে সে সময় রাজধানী কাবুলে আফগানরা তালেবানদের অভিনন্দন জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ফরাসি সংবাদপত্র লা ফিগারোর কাবুল থেকে করা দুটি রিপোর্ট অনুযায়ী এ বক্তব্য সামনে এসেছে।
লা ফিগারোর কাবুল সংবাদদাতা মারগো বেন বলেছেন, এটা স্পষ্ট যে, এ আলোচনায় তালেবানের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা আফগানিস্তানের অর্ধেকেরও বেশি এলাকাজুড়ে তাদের আধিপত্য ধরে রেখেছে এবং কিছুদিন আগেও কয়েকটি বড় হামলা ও অপারেশন চালিয়েছে। আফগান সরকার জনসমর্থন হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তারা এতদিন মার্কিন বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল ছিল। তারা চলে গেলে আফগান সরকার আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সক্রিয় থাকার মতো শক্তি হারাবে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে রাখঢাক ছাড়াই কথা বলছে। সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে তারা সেনা প্রত্যাহারের কাজ শুরু করবে। ট্রাম্পের ২০২০ সালের নির্বাচনী ক্যাম্পেইনে জনসমর্থন আদায়ের লক্ষ্যেই সেনা প্রত্যাহারের কাজটি দ্রুততার সঙ্গে করা হবে। আজ আফগানরা এমন এক ঘটনার জন্য অপক্ষো করছে কিছুদিন আগেও যার কথা তারা কল্পনা করতে পারেনি। তা হলো তালেবানের ক্ষমতায় ফিরে আসা।

২০০১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ঢেলেছে; কিন্তু এই অর্থ প্রান্তিকভাবে ব্যয়িত হয়েছে। রাজধানীর উন্নত এলাকাগুলোতে অধিকাংশ অর্থ সহায়তা কাজে লাগানো হয়েছে; দেশের দরিদ্র এলাকাগুলোর প্রতি নজর দেওয়া হয়নি। অথচ রাজধানীর এলিট শ্রেণি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে কোনো ধরনের দায়বদ্ধতা স্বীকার করে না, যদিও দরিদ্র এলাকাগুলোতে জনসংখ্যা অনেক বেশি।
অন্যদিকে যেসব পশ্চিমা গোষ্ঠী আফগানিস্তানে বিনিয়োগ করেছে তারা নিজেদের সুরক্ষিত রেখেছে। তাদের আফগান জনগণের জীবনযাপনের উন্নতি ঘটল কী ঘটল না সেদিকে মনোযোগ দেয়নি।
লা ফিগারোর স্থানীয় সংবাদদাতা তালেবানের ব্যাপারে কয়েকজন আফগানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। শাকসবজি ও ফল বিক্রেতা মুহাম্মদ তালেবানের ক্ষমতা থেকে চলে যাওয়ার কারণে আফসোস করে বলেছেন, ‘আফগান সরকার আমাদের প্রতি যথেষ্ট অবহেলা দেখিয়েছে। তারা আমাদের কোনো গুরুত্বই দেয়নি। তালেবানের শাসনামলে অন্ততপক্ষে সমাজে কোনো ধরনের জুলুম ছিল না, অবিচার ছিল না। সবাই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। বিবাদ-বিসম্বাদ তিন দিনের মধ্যে মীমাংসা করে দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান সময়ে একটি মোকাদ্দমার নিষ্পত্তি হতে তিন বছরেরও বেশি সময় লাগে। ঘুষ প্রদান ব্যতীত বা মামা-খালুর জোর না থাকলে কোনো বিচার পাওয়া যায় না।’
মুহাম্মদ তার কথা শেষ করতে পারেননি, এরই মধ্যে একজন বৃদ্ধ লোক তাকে থামিয়ে দিলে বলে ওঠেন, ‘তার কথা সত্য।’ তিনি তার হাতের তাসবিহ দানায় সাবেক তালেবান সরকারের অবদান কী কী তা গুনতে শুরু করেন। গণনা শেষ না করেই বলেন, ‘তালেবান আমাদের ভাই। আমরা আশা করি তারা ফিরে আসবে এবং দেশে নতুনভাবে সরকার ব্যবস্থা গঠন করবে।’
লা ফিগারোর স্থানীয় সংবাদদাতা তালেবানের ফিরে আসার ব্যাপারে কয়েকজন বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের সদস্যের সঙ্গেও কথা বলেছেন। কিন্তু ইতিবাচক জবাব পাননি। আফগানিস্তানের বঞ্চিত ও পীড়িত মানুষের মনে তাদের দেশের গণতন্ত্রের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মেছে। তাদের আশা ভঙ্গ হয়েছে। এই গণতন্ত্র গোটা দেশকে অরজকতায় নিমজ্জিত করেছে। ফলে তারা তালেবানদের ফিরে আসায় খুশি।
যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগান সমাজের অধিকাংশ মানুষই এখন দেশটিতে শান্তি প্রত্যাশা করছেন। শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে অবশ্যই তালেবানের সঙ্গে সমঝোতা জরুরি এবং তা ক্ষমতার বণ্টন ছাড়া সম্ভব নয়।
সূত্র : আলজাজিরা

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *