রওজার মূল দরজা – হজ ও ওমরা পালনকারীদের মদিনা আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো- নবী করিম (সা.)-এর রওজা মোবারক জিয়ারত করা, রওজায় সালাম পেশ করা। এই পবিত্র ভূমি মদিনার মসজিদে নববীতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মোহাম্মদ (সা.)।নবীজি যে ঘরটিতে স্ত্রী আয়েশা (রা.) কে নিয়ে বসবাস করতেন সে ঘরটিতে মৃত্যুর পর তাকে দাফন করা হয়। রাসূলের রওজার পাশে ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) ও ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর (রা.)-এর কবর। পাশে আরেকটি কবরের জায়গা খালি। এখানে হযরত ঈসা (আ.)-এর কবর হবে।

এ কারণে হজপালনের আগে কিংবা পরে হাজিরা মদিনা শরিফ আসেন। মদিনায় অবস্থানকালে হাজিদের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হচ্ছে, মসজিদে নববিতে হাজিরা দেওয়া এবং সেখানে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। মসজিদে নববিতে এক রাকাত নামাজের সওয়াব পঞ্চাশ হাজার রাকাত নামাজের সমান। এছাড়া মসজিদে নববীতে বিরতিহীনভাবে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায়ের আলাদা ফজিলত রয়েছে।সুদীর্ঘ ৭০০ বছরেও নবীজির রওজার মূল দরজা খোলা হয়নি। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের আবেগ এতটাই বেশি যে নবীজির রওজার দরজা খোলা থাকলে ধুলোবালিও নিয়ে যেতো। তাই নবীজির রওজা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা বেশ খানিকটা দূর থেকে রওজা জিয়ারতের সুযোগ দেন।

সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী নবীজির রওজা মোবারক নিয়ে নানা অপপ্রচার চলছে। বিভিন্ন দেশে নবীজি ও খলিফাদের ভুয়া রওজার ছবি দেখিয়ে অবৈধ অর্থ রোজগারের অপচেষ্টা চলছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছাড়া আর কারও কাছে মাথা নত করা উচিত নয় বলে ওই কর্মকর্তা মন্তব্য করেন।তাছাড়াও রওজা শরীফ সর্ম্পকে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হয়রত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি আমার মসজিদে চল্লিশ ৪০ দিন জামাতের সাথে নামাজ আদায় করেছে আর কোনো নামাজ কাজা করেনি, সে নিফাক (মোনাফিকি) আর দোজখের আজাব থেকে নাজাত পাবে।হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা শরিফ জিয়ারতের ফজিলত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর তার রওজা মোবারক জিয়ারতে করলো, সে যেন রাসূলুল্লাহ (সা.) কে জীবদ্দশায় দশন করলো।

মসজিদে নববিতে প্রবেশের অনেকগুলো দরজা রয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিম পাশে রাসূলের রওজা জিয়ারতের জন্য যে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হয়, ওই দরজাকে ‘বাবুস সালাম’ বলা হয়। বাবুস সালাম দিয়ে প্রবেশ করে রাসূলের রওজায় সালাম শেষে ‘বাবুল বাকি’ দিয়ে বের হতে হয়।মদিনায় জিয়ারতে হাজীদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ মদিনায় এসে দুনিয়ায় জীবিত থাকতে জান্নাতে ভ্রমণের সুযোগ মেলে। কারণ নবী করিম (সা.)-এর রওজা শরিফ এবং এর থেকে পশ্চিম দিকে রাসূলে করিম (সা.)-এর মিম্বর পযন্ত স্বল্প পরিসরের স্থানটুকুকে রিয়াজুল জান্নাত বা বেহেশতের বাগিচা বলা হয়। এটি দুনিয়াতে একমাত্র জান্নাতের অংশ। এই স্থানে স্বতন্ত্র রঙয়ের কার্পেট বিছানো থাকে।

এই স্থানটুকু সম্পর্কে হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমার রওজা ও মিম্বরের মধ্যবতী স্থানে বেহেশতের একটি বাগিচা বিদ্যমান। এখানে প্রবেশকরা মানে জান্নাতে প্রবেশ করা।বস্তুত দুনিয়ার সব কবরের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশি জিয়ারতের উপযুক্ত স্থান হলো- রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রওজা মোবারক। তাই এর উদ্দেশে সফর করা উত্তম। এ কথার ওপর পূর্বাপর সব উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য রয়েছে।

তাহাজ্জুদ নামায কত রাকাত, কীভাবে নিয়ত করতে হয়?

প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম। তাহাজ্জুদ নামাযের নূন্যতম রাকাত সংখ্যা কত? দুই বা চার রাকাত পড়লে কি তাহাজ্জুদ নামায হিসেবে গণ্য হবে? এই নামাযের নিয়ত চার রাকাত নামাযের নিয়তের মত নাকি দুই রাকাত নামাযের নিয়তের মত করতে হবে?

উত্তর:

আবু সালামা ইবনে আব্দুর রহমান (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি হযরত আয়েশা (রা.) কে জিজ্ঞাসা করেন যে, রমযানে নবীজীর নামায কেমন হত? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) রমযানে এবং রমযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না।

প্রথমে চার রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করো না! এরপর আরও চার রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য
ও দীর্ঘতা তো বলাই বাহুল্য! এরপর তিন রাকাত (বিতর) পড়তেন। -সহীহ বুখারী ১/১৫৪, হাদীস ১১৪৭; সহীহ মুসলিম ১/২৫৪, হাদীস ৭৩৮; সুনানে নাসায়ী ১/২৪৮, হাদীস ১৬৯৭; সুনানে আবু দাউদ ১/১৮৯, হাদীস ১৩৩৫; মুসনাদে আহমদ ৬/৩৬, হাদীস ২৪০৭৩

আব্দুল্লাহ ইবনে আবী কাইস বলেন, قلت لعائشة : بكم كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يوتر؟ قالت: كان يوتر بأربع وثلاث, وست وثلاث, وثمان وثلاث, وعشر وثلاث, ولم يكن يوتر بأنقص من سبع, ولا بأكثر من ثلاث عشرة.

অর্থাৎ, আমি হযরত আয়েশা রা.-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম যে, নবীজী বিতরে কত রাকাত পড়তেন? উত্তরে তিনি বলেন, চার এবং তিন, ছয় এবং তিন, আট এবং তিন, দশ এবং তিন। তিনি বিতরে সাত রাকাতের কম এবং তেরো রাকাতের অধিক পড়তেন না। -সুনানে আবু দাউদ ১/১৯৩, হাদীস ১৩৫৭ (১৩৬২); তহাবী শরীফ ১/১৩৯; মুসনাদে আহমদ ৬/১৪৯, হাদীস ২৫১৫৯

উল্লেখিত বর্ণনা দ্বারা বুঝা গেল রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনো তাহাজ্জুদ নামায চার রাকাত পড়তেন, কখনো ছয় রাকাত পড়তেন। কখনো আট রাকাত পড়তেন। কখনো দশ রাকাত পড়তেন।

সুতরাং তাহাজ্জুদের নামায ১০ রাকাত পর্যন্ত পড়া রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে আমরা সহীহ হাদীসে পাই। এর চে’ বেশি পড়া যাবে না, এমন নয়। যেহেতু এটি নফল নামায তাই যতো বেশি পড়া যায় ততোই সওয়াব। তাই ইচ্ছেমত পড়া যায়।

সেই সাথে চার রাকাতের কম পড়লে তা তাহাজ্জুদ হবে না, বিষয়টি এমনও নয়। তাই দুই রাকাত পড়লেও তা তাহাজ্জুদ নামায হিসেবেই গণ্য হবে। সময় কম থাকলে দুই রাকাত পড়ে নিলেও তাহাজ্জুদ নামায পড়া হয়েছে বলে ধর্তব্য হবে।

রাতের এবং দিনের নফল নামাযের নিয়ত চার রাকাত করেও নিয়ত করা যায়, এমনিভাবে দুই রাকাত করেও নিয়ত করা যায়। কোন সমস্যা নেই।

তাই আপনি তাহাজ্জুদ নামাযের নিয়ত চাইলে ২ রাকাতের নিয়ত করে ২ রাকাত ২ রাকাত করে পড়তে পারেন। অথবা ৪ রাকাত ৪ রাকাত নিয়ত করে ৪ রাকাত করে পড়তে পারেন। -ফাতওয়ায়ে শামী-২/৪৫৫; তাবয়ীনুল হাকায়েক-১/১৭২; আল বাহরুর রায়েক-২/৫৩; ফাতওয়ায়ে মাহমুদিয়া-১১/২৮৭

উত্তর প্রদান করেছেন- মুফতী লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, পরিচালক-তালীমুল ইসলাম ইনষ্টিটিউট এন্ড রিসার্চ সেন্টার ঢাকা।

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *