শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের দুটি মসজিদে হামলার ঘটনায় মুসলিম অভিবাসীদের দায়ী করা অস্ট্রেলিয়ার সিনেটর ফ্রেসার অ্যানিংয়ের মাথায় ডিম ফাটিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন এক কিশোর। শনিবার মেলবোর্নের মোরাবিনে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সময় হেনস্তার স্বীকার হয় কট্টর এ অস্ট্রেলিয়ান সিনেটর।

এদিকে এ ঘটনার পর ব্যাপক প্রশংসায় ভাসছেন সিনেটরের মাথায় ডিম ফাটানো সেই কিশোর। সেইসঙ্গে ওই কিশোরকে হামলা ও তাকে নোংরা কথা বলার জন্যে সিনেটর ফ্র্যাসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের ও বহিষ্কারের দাবি তুলছে অস্ট্রেলিয়ার জনগণ। এছাড়া আটক ওই কিশোরের পক্ষে আইনি লড়াই করতে তহবিল গঠন করা হয়েছে।

বার্তা সংস্থা নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্র্যাসার অ্যানিংয়কে বহিষ্কারের দাবিতে চার্জডটঅর্গের মাধ্যমে অন্তত ৫ লাখ ব্যক্তি আবেদন করেছেন। এছাড়া ফ্র্যাসার অ্যানিংয়ের কঠোর সমালোচনা করছেন দেশটির অনেক রাজনৈতিক নেতা। সমালোচনা করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনও।

কিশোরকে মারধর করায় ওই সিনেটরের সমর্থকদের নিষ্ঠুর বলে অভিহিত করেছেন দেশটির জনগণ। সেইসঙ্গে ওই কিশোরকে দিচ্ছেন হিরোর তকমা। অস্ট্রেলিয়ার একজন সিনেটর ডেরিন হিঞ্চ টুইটার বার্তায় জানান, অ্যানিংয়ের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রবৃত্তিগতভাবে। কিন্তু, তার গুণ্ডাদের প্রতিক্রিয়া ছিলো মাত্রাতিরিক্ত।

ওই কিশোরের পক্ষে আইনি লড়াই ও আরো ডিম কেনার জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে শুরু করেছে একটি তহবিল সংগ্রহকারী সংস্থা। জানা যায়, গত ১৭ ঘণ্টায় ‘গোফান্ডমি’ প্রচারণার মাধ্যমে সংস্থাটি ১৪ হাজার মার্কিন ডলার সংগ্রহ করেছে।

শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে জুমার নামাজের সময় অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত ডানপন্থী শেতাঙ্গ সন্ত্রাসী ব্রেন্টন ট্যারেন্টের গুলিতে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছেন অন্তত ৪৮ জন।

তবে ভয়াবহ হামলার পর এক বিবৃতিতে ফ্রেসার অ্যানিং বলেছিলেন, মুসলিমদের উপস্থিতি বাড়ার ফলে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড উভয় সম্প্রদায়ের ভয়কে বাড়িয়ে তুলছে। তার এমন বিতর্কিত মন্তব্য সমালোচিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

আল জাজিরা জানায়, শনিবার সংবাদ সম্মেলনে অ্যানিং কথা বলার সময় তার পেছনে এক কিশোর দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ করেই ওই কিশোর বাঁ-হাতে মোবাইল ধরে ডান হাতে অ্যানিংয়ের মাথায় একটি ডিম ফাটিয়ে দেন। এর একটু আগে সে তার মোবাইলে ভিডিও করা শুরু করে। ডিম ছোড়ার পরও নির্বিকার ভঙ্গিতে ভিডিও করে যাচ্ছিল সে।

হতবাক অ্যানিং পেছনে ঘুরে কিশোরের মুখে চড় মারতে শুরু করলে দুজনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। এ সময় পাশে থাকা লোকজন ওই কিশোরকে মাটিতে চেপে ধরেন এবং আটক করেন, আর অন্য একজন অ্যানিংকে সরিয়ে নেয়।

বিশ্বব্যাপী প্রশংসায় ভাসছেন সেই কিশোর, আইনি লড়াই করতে ২ হাজার ডলার চেয়ে পাওয়া গেল ১৪ হাজার ডলার

মুসলিমদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশে কালো ওড়না মাথায় জড়িয়েছেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় বারবার গণমাধ্যমের সামনে এসে নিজেই তথ্য জানাচ্ছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আরদার্ন।

সংবাদ সম্মেলন থেকে শুরু করে আহতদের দেখতে যাওয়া, তাদের খোঁজখবর নেয়া- সবখানেই নিজে যাচ্ছেন। যেখানেই যাচ্ছেন, যার সঙ্গেই কথা বলছেন, সবখানেই তাকে দেখা যাচ্ছে বিমর্ষ অবয়বে।

শোক প্রকাশে শুধু কালো পোশাকই পরেননি, মসজিদে নামাজরত মুসলিমদের হামলার ঘটনায় নিউজিল্যান্ডের মুসলিমদের প্রতি একাত্মতা প্রকাশে মাথায় ওড়না জড়িয়ে রয়েছেন।

আরদার্নের আচরণ আর চেহারার অভিব্যক্তিতেই বোঝা যাচ্ছে, শোক শুধু তার বক্তব্যে নেই, ভয়াবহ এ হামলার শোক তার মনেও আঘাত হেনেছে।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর এমনই কিছু ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমগুলোতে।এর মধ্যে ওপরের ছবিটি ব্যাপকভাবে শেয়ার হচ্ছে।

ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে, কালো পোশাকের সঙ্গে কালো ওড়না মাথায় জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জাসিন্দা। চোখে যেন স্বজন হারানোর করুণ দৃষ্টি। দেখে মনে হচ্ছে হয়তো এক্ষুণি কেঁদে ফেলবেন। কিন্তু হাত দুটো একসঙ্গে শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছেন তিনি, যেন দেশের এই ভয়ানক শোকের দিনে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছেন।

জাসিন্দা আরদার্ন তার পোশাকের মধ্য দিয়ে দেশের শোকাহত মুসলিম জনগোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু ছবিতে তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি আর চোখের দৃষ্টিই মনকে নাড়িয়ে দেয়ার মতো। এই ছবি শেয়ার করে অনেকেই বলছেন, প্রধানমন্ত্রী যেন এর মধ্য দিয়ে শুধু নিজের শোক নয়, পুরো দেশের শোককে তুলে ধরেছেন।

পাকিস্তান অ্যাসোসিয়েশন অব নিউজিল্যান্ডের পোস্ট করা একটি ভিডিওতে প্রধানমন্ত্রীকে মুসলিমদের উদ্দেশে কথা বলতে দেখা গেছে। সেখানেও তিনি বলেছেন, এটি আমাদের দেশের জন্য বিশাল এক শোকের ঘটনা। আপনারাই আমরা, আর তাই যা ঘটেছে তার কষ্ট আমরা মনের গভীরে অনুভব করতে পারছি।

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *