রেলের যাত্রী পরিবহন ভাড়া বাড়ছে। এরই মধ্যে ভাড়া বৃদ্ধি-সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণের শর্তে এ প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। গড়ে ২৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সুপারিশ করা হলেও রুট ভেদে এসি চেয়ারের ভাড়া বাড়বে ৩৯ থেকে ৬৪ শতাংশ। নতুন প্রস্তাব কার্যকর হলে রেলের কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ৩৯ পয়সা থেকে বেড়ে হবে ৪৯ পয়সা।

এছাড়া যাত্রী পরিবহনে ন্যূনতম ভাড়া বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে পণ্য পরিবহনের ভাড়া, কনটেইনার ও পার্সেল পরিবহন মাশুল বাড়ানোর প্রস্তাবও তৈরি করেছে রেলওয়ে। আগামী জুন মাসের মধ্যে বর্ধিত ভাড়া কার্যকর করার প্রস্তুতি নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার বাড়বে ভাড়া। সেবা নিয়ে প্রতিনিয়তিই বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ থাকলেও রেলের ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যাত্রীরা বলছেন, রেলের আন্তঃনগর শ্রেণীর অনেক ট্রেনে বসার আসনের অবস্থা যাচ্ছেতাই। প্রতিটি ট্রেনে খাবার গাড়ি থাকার কথা থাকলেও সিলেট রুটের কালনী এক্সপ্রেস কয়েক বছর থেকে ছয় থেকে সাতটি কোচে চলছে। নেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আসন। খাবার গাড়িও যুক্ত থাকে না এই ট্রেনে। অথচ বর্ধিত ভাড়া অনুযায়ী এ ট্রেনে ৬১০ টাকার ভাড়া হবে এক হাজার টাকা।

আবার লালমনী এক্সপ্রেস ট্রেন প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে। বেশির ভাড়া ট্রেনে বিলম্ব ঘটিয়ে চলে। শিডিউল ঠিক থাকে না ঈদসহ গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে। এ অবস্থায় রেলের সেবা না বাড়িয়ে বছরে বছরে ভাড়া বাড়ানোর সমালোচনা করেছে গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন।

রেল মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গড়ে ২৫ শতাংশ ভাড়া বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে রেলের কিলোমিটারপ্রতি ভিত্তিভাড়া ৩৯ পয়সা থেকে বেড়ে হবে ৪৯ পয়সা। যদিও রুটভেদে শোভন চেয়ারে ভাড়া বাড়ছে ২২ থেকে ৪৭ শতাংশ, আর এসি চেয়ারে রুটভেদে ভাড়া বাড়ছে ৩৯ থেকে ৬৪ শতাংশ পর্যন্ত।

উল্লেখ্য, প্রায় ২০ বছর পর ২০১২ সালে রেলের ভাড়া বাড়ানো হয়। ওই সময়ে রেলের যাত্রী পরিবহনের কিলোমিটারপ্রতি ভিত্তিভাড়া ২৪ থেকে বাড়িয়ে ৩৬ পয়সা করা হয়। ৫০ শতাংশ ভাড়া বাড়ানো হলেও বিভিন্ন রুটে থাকা ডিসকাউন্ট তুলে দেওয়ায় ভাড়া বেড়েছিল প্রায় শতভাগ। এরপর ভাড়া বাড়ানো হয় ২০১৬ সালে। ওই সময় কিলোমিটারপ্রতি ভিত্তিভাড়া ৩৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৯ পয়সা করা হয়।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের শোভন চেয়ারের বর্তমান ভাড়া ৩৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৬৫ টাকা করা হবে। এসি চেয়ার কোচের ভাড়া ৬৫৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হবে এক হাজার ৭০ টাকা। ঢাকা-খুলনা রুটে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৫০৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৩০ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। আর এসি চেয়ারের ভাড়া ৯৬৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৪৪৩ টাকা করা হবে। এদিকে, ঢাকা-সিলেট রুটের ক্ষেত্রে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩২০ টাকা থেকে ৪৩৫ টাকা এবং এসি চেয়ারে ৬১০ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার এক টাকা করা হবে। মালবাহী ট্রেনের ভাড়াও প্রস্তাব অনুযায়ী ২৫ ভাগেরও বেশি করা হবে।

এদিকে নতুন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন রেলওয়ের যাত্রীসেবার চিত্র দেখে নিজেই হতাশ। গত ৫ মার্চ কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীসেবায় অব্যবস্থাপনা দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এক মাসের আলটিমেটাম দিয়েছেন তিনি।

গত কয়েক দিন কমলাপুর রেলস্টেশনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পরিস্থিতি বদলায়নি। ট্রেনের কোচে তেলাপোকা ও মশার উপদ্রব। আর সময়মতো ট্রেন ছাড়ে না।

এসব অব্যবস্থাপনার মধ্যেই ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর উদ্যোগের বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘ট্রেন হলো গণপরিবহন। বিশেষ করে নিম্ন, নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির যাত্রীরা বারবার ভাড়া বাড়ানোয় বিপদে পড়ে। এবার সুলভ শ্রেণির আসনের ভাড়াও বাড়ানো হবে—এটা দুঃখজনক।’

জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘এডিবির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে আমরা রেলে যাত্রী ভাড়া সমন্বয় করব। রেলওয়ে প্রস্তাব তৈরি করেছে। তা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। আগামী জুনের মধ্যে তা কার্যকর করা হবে বলে আশা করছি।’

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *