‘হে ঈমানদাররা! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর। আর তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা তা তোমরা কখনও গ্রহণ করবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৬৭)। অনুরূপভাবে উশর প্রদান করা আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ভূমি আসমান বা ঝরনার পানি দ্বারা সিঞ্চিত হয় তার উৎপাদিত ফসলের দশভাগের একভাগ; আর যে জমি
সেচের পানি দ্বারা সিক্ত হয় তার ফসলের বিশভাগের একভাগ দান করতে হবে।’

ইসলাম এমন এক কল্যাণকর ধর্ম, যা রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক প্রয়োজনগুলো পূরণ করার প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ রেখেছে। ইসলামি শরিয়ত প্রজাসাধারণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করাকে সমসাময়িক রাষ্ট্রপ্রধানের ওপর অপরিহার্য করে দিয়েছে। ইসলামি রাষ্ট্রের যে কোনো নাগরিক রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে নিজের অধিকার আদায়ের দাবি জানাতে পারেন। সমাজ থেকে অভাব-অনটন ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য ইসলাম প্রতিটি ব্যক্তির ওপর আর্থিক কিছু দায়দায়িত্ব আরোপ করেছে। প্রত্যেকটি ব্যক্তি যদি নীতি ও নৈতিকতার সঙ্গে এসব দায়িত্ব আঞ্জাম দেয় এবং পুরো দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ইসলামের পক্ষ থেকে আরোপিত আর্থিক কর্তব্যগুলো সম্পাদন করে, তা হলে রাষ্ট্রের কোনো পরিবারকেই অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান ছাড়া দিনাতিপাত করতে হবে না। ইসলাম কর্তৃক আরোপিত আর্থিক দায়িত্বগুলোর অন্যতম হলো উশর।
আজকাল কৃষক-সমাজ ফসলের ক্ষয়ক্ষতি, অকাল বর্ষণ, আকস্মিক দুর্যোগ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দরুন ফসল কম হওয়ার কারণে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকেন! এর প্রতিকারের নিমিত্তে তারা বিভিন্ন ধরনের পথ ও পন্থা অবলম্বন করেন। উৎপাদনশীল ফসলের সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য ব্যয়বহুল স্প্রে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তারপরও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না, বরং দিন দিন নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হয়! প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্বিপাক দেখা দেয়! প্রকৃতপক্ষে এসব সমস্যা, ক্ষয়ক্ষতি ও বিপর্যয়ের কারণ হলো উৎপাদিত ফসলের ওপর আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত হক উশর আদায় না করা।

উশর শব্দের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থ
উশর শব্দটি আরবি ‘আশারাতুন’ থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ হলো এক-দশমাংশ। আর কৃষিজাত ফল-ফসলের ওপর আরোপিত জাকাতকে শরিয়তের পরিভাষায় উশর বলা হয়। এজন্য ইসলামি আইনবিশারদ ফকিহরা উশরকে ‘ফল-ফসলের জাকাত’ বলে অভিহিত করেছেন। অবশ্য এর বিধিবিধান জাকাতের বিধিবিধানের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। সাধারণ জাকাত ও উশরের মধ্যে পার্থক্য হলো : জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য মৌলিকভাবে দুটি শর্ত পাওয়া জরুরি। ১. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জাকাত প্রদানযোগ্য সম্পদের মালিক হওয়া, ২. এই সম্পত্তি তার মালিকানায় থাকা অবস্থায় পূর্ণ এক বছর অতিবাহিত হওয়া। আর উশর অপরিহার্য হওয়ার ক্ষেত্রে এ দুই শর্তের কোনোটিই পাওয়া জরুরি নয়। এজন্য কোনো কৃষক যদি অল্প পরিমাণে ফসল ফলাতে সক্ষম হয় এবং সেই ফসল তার কাছে থাকা অবস্থায় এক বছর অতিক্রান্ত না হয়, তা হলেও তার ওপর উশর প্রদান করা অপরিহার্য। জেনে রাখা দরকার, উশর ওয়াজিব হওয়ার জন্য জমি ব্যক্তিগত হওয়া জরুরি নয়, বরং কেউ যদি ভাগে কিংবা বর্গা অথবা ধার হিসেবে জমি চাষ করে, তা হলেও তার ওপর উৎপন্ন ফসলের উশর প্রদান করা আবশ্যক। অবশ্য ধার কিংবা ইজারাদারির ভিত্তিতে যদি কেউ চাষ করে, তা হলে শুধু কৃষকের ওপর ফসলের এক-দশমাংশ প্রদান করা অপরিহার্য হবে। আর বর্গা চাষের ভিত্তিতে যদি ফসল ফলানো হয়, তা হলে কৃষক ও জমির মালিক উভয়ের ওপর ফসলের নির্ধারিত অংশ প্রদান করা আবশ্যক হবে।

উশর আদায় করা আবশ্যক হওয়ার প্রমাণ
মহাগ্রন্থ কোরআন এবং মহানবী (সা.) এর বাণীর আলোকে উশর আদায় করা অপরিহার্য (ওয়াজিব) হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। এ ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তিনিই উদ্যানগুলো সৃষ্টি করেছেন এবং যা মাচার ওপর তুলে দেওয়া হয়। আর যা মাচার ওপর তোলা হয় না এবং খর্খূর বৃক্ষ ও শস্যক্ষেত্র যেসবের স্বাদ বহুধর্মী এবং যয়তুন ও আনার সৃষ্টি করেছেনÑ একে অন্যের সাদৃশ্যশীল এবং সাদৃশ্যহীন। তোমরা এগুলোর ফল খাও, যখন ফলন্ত হয় এবং হক (উশর) দান কর কর্তনের সময়।’ (সূরা আনআম : ১৪১)। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা স্বীয় উপার্জন থেকে এবং যা আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে উৎপন্ন করেছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট বস্তু ব্যয় কর। আর তা থেকে নিকৃষ্ট জিনিস ব্যয় করতে মনস্থ করো না। কেননা তা তোমরা কখনও গ্রহণ করবে না।’ (সূরা বাকারা : ২৬৭)। অনুরূপভাবে উশর প্রদান করা আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ভূমি আসমান বা ঝরনার পানি দ্বারা সিঞ্চিত হয় তার উৎপাদিত ফসলের দশভাগের একভাগ; আর যে জমি সেচের পানি দ্বারা সিক্ত হয় তার ফসলের বিশভাগের একভাগ দান করতে হবে।’ (বোখারি : ১৪৮৩)। উশর আদায় করা এমন এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, যা অপরিহার্য হওয়ার ব্যাপারে নববি যুগ থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত প্রতিটি যুগের ইসলামি আইনবিশারদ ফকিহ আলেমরা ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। আল্লামা কাসানি (রহ.) উশর আদায় করা ফরজ হওয়ার ওপর উম্মতের সর্বসম্মত অভিমত ইজমা সংঘটিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এজন্য উশর আদায় না করা পর্যন্ত তা আদায়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া যাবে না। বরং জীবনের যে কোনো সময় হলেও তা আদায় করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য জরুরি। যদি কোনো ব্যক্তি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উশর আদায় করতে সক্ষম না হয়, তা হলে তা আদায়ের অসিয়ত করে যাওয়া তার জন্য আবশ্যক। অন্যথায় পরকালে শাস্তি ভোগ করার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।

উশরের পরিমাণ
বৃষ্টির পানির মাধ্যমে ফসল উৎপন্ন হোক কিংবা সেচের পানির মাধ্যমে উৎপাদিত হোক উভয় প্রকার জমির ফসলের ওপর উশর প্রদান করা ওয়াজিব। অবশ্য বৃষ্টির পানির মাধ্যমে উৎপাদিত ফসলের দশভাগের একভাগ প্রদান করা আবশ্যক। বৃষ্টির পানির মাধ্যমে যে জমির ফসল উৎপন্ন হয় তাতে কৃষকের পক্ষ থেকে পানি সেচ করার কোনো প্রয়োজন থাকে না। আর সেচনির্ভর জমি বলতে এমন জমিকে বোঝায়, যার মধ্যে কৃষক নিজের পক্ষ থেকে মেশিন, কল বা অন্য কোনো মাধ্যমে পানি সিঞ্চন করে থাকেন। এসব জমিতে ফসল ফলানোর ক্ষেত্রে কৃষকের কষ্ট বেশি হওয়ার কারণে শরিয়ত এমন জমির ফসলের ওপর বিশভাগের একভাগ উশর প্রদান করা অবধারিত করেছে।

উশর ব্যয়ের খাত
উশর ব্যয়ের উপযুক্ত লোক তারাই, যারা জাকাত গ্রহণ করার উপযুক্ত বলে গণ্য। অর্থাৎ প্রত্যেক এমন ব্যক্তি, যার মালিকানায় সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা তার সমমূল্যের স্বর্ণ, নগদ অর্থ, ব্যবসায়-সম্পদ বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্যদ্রব্য নেই। এমন ব্যক্তি উশর গ্রহণ করার উপযুক্ত। তাকে উশর দেওয়া যায়। অবশ্য দ্বীনি খেদমতের সঙ্গে যুক্ত কোনো ব্যক্তিকে উশর দেওয়া অধিকতর উত্তম। এতে উশর আদায় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বীনের খেদমতে সহযোগিতার সওয়াব পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে কোনো আত্মীয়স্বজনকে দেওয়ার মাধ্যমে উশর আদায় করার সওয়াব পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার পুণ্যও অর্জিত হয়।

উশর আদায়ের ফজিলত
জাকাত আদায় করলে যেমন সম্পদ বৃদ্ধি পায় ও পবিত্র হয়, ঠিক তেমনি উশর আদায় করলেও ফসল বৃদ্ধি পায় ও পবিত্র হয়। সম্পদে উন্নতি, সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য দেখা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিপদাপদ ও দুর্যোগ-দুর্বিপাক থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, ঝড়-তুফান, বন্যা, খরা ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকা যায়। হাদিসে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জনৈক ব্যক্তি একটি বিজন বনে দাঁড়িয়ে ছিল! এমন সময় শূন্যম-ল থেকে আওয়াজ ভেসে এলো; কেউ মেঘমালাকে বলছে, অমুকের বাগানে বারিবর্ষণ করো! ফলে মেঘমালাটি সেদিকে সরে গিয়ে প্রস্তরময় ভূমিতে বারিবর্ষণ করতে লাগল! তখন দেখা গেল সেখানকার নালাগুলোর মধ্য থেকে একটি নালা বৃষ্টির সব পানি গ্রাস করে নিচ্ছে! তারপর ওই ব্যক্তি বর্ষিত পানির পেছনে চলতে লাগল। কিছুদূর গিয়ে সে দেখতে পেল, জনৈক ব্যক্তি কোদাল দিয়ে নিজের বাগানের দিকে পানি ফিরিয়ে দিচ্ছে! তখন সে তাকে জিজ্ঞেস করল, আল্লাহর বান্দা! তোমার নাম কী? লোকটি ওই নাম বলল, যার কথা সেই ব্যক্তি শূন্যম-ল থেকে শুনেছিল! লোকটি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার নাম জিজ্ঞেস করছ কেন? সেই ব্যক্তি উত্তর দিল, আমি মেঘমালা থেকে একটি আওয়াজ শুনেছি, যার মধ্যে বলা হয়েছিল, ‘অমুকের বাগানে বারিবর্ষণ করো।’ আর সেই লোকটি হলে তুমি! এখন আমাকে বল : এই বিপুল মর্যাদা তুমি কীভাবে অর্জন করলে? লোকটি বলল, তুমি যেহেতু জিজ্ঞেস করেছ, তা হলে তো বলতেই হয়। আমি এ বাগানের ফল হওয়ার পর তাকে তিন ভাগে ভাগ করি। এরপর এক ভাগ দান করে দিই, আর একভাগ পরিবার-পরিজনকে নিয়ে খাই ও অন্যভাগের মাধ্যমে বাগানের ব্যয় নির্বাহ করি!’ (মুসলিম : ২৯৮৪)।
আলোচ্য হাদিসের মাধ্যমে প্রতীয়মান হয়, কেউ যদি তার জমির উৎপাদিত ফসল ও ফলফলাদির হক তথা উশর আদায় করে, তা হলে আল্লাহ তায়ালা তার ফল ও ফসলে বরকত দান করেন। তাকে বিভিন্ন বালামুসিবত থেকে রক্ষা করেন। তাই জমির উৎপাদিত ফসলের ওপর নির্ধারিত জাকাত বা উশর আদায় প্রতিটি মোমিনের জন্য একান্ত কর্তব্য।

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *