পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা- রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে নয়কিলো এলাকায় নির্বাচনী দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে ৭জন নিহত হবার খবর পাওয়া গেছে। সোমবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় আরো সাত থেকে আটজন আহত হয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে নিহত ও আহতদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি। সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে। বাঘাইছড়ি থানা পুলিশের অফিসার ইনচার্জ মঞ্জুরুল আলম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। বাঘাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মনজুর বলেন, ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষে গাড়িতে ফেরার পথে বাঘাইছড়ির ৯ কিলো নামক স্থানে দুর্বৃত্তের গুলিতে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় জানা গেছে তারা হলেন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা শিজক কলেজের শিক্ষক আব্দুল হান্নান, ভিডিপি মো. আল আমিন, ভিডিপি বিলকিস (৩৫), ভিডিপি মিহির কান্তি দত্ত ও কিশালয় প্রাথমিক সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আমির হোসেন। পুলিশ জানায়, রাঙামাটির বাঘাইছড়ির সাজেক ইউনিয়নের কংলাক এলাকায় ভোটগ্রহণ ও গণনা শেষে গাড়িতে করে ফিরছিলেন প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারসহ ভোট গ্রহণ কাজে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বাঘাইছড়ির ৯ কিলো নামক এলাকায় পৌঁছালে সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালান। এতে সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২০ জন। রাঙামাটিরর পুলিশ সুপার আলমগীর কবীর জানিয়েছেন, বাঘাইছড়ির কংলাক থেকে নির্বচনি সরঞ্জাম নিয়ে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের ব্রাশফায়ারে তাৎক্ষণিক তিনজন নিহত হন। হাসপাতালে আরো চারজনের মৃত্যু হয়। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এ ঘটনায় আরও ৭-৮ জন গুলিবিদ্ধ আছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। আহতদের বাঘাইছড়ি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাঘাইছড়িতে নয়কিলো এলাকায় সন্ত্রাসীরা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ওপর এই হামলা চালান।এর আগে রাতে ব্যালট বাক্স ভরে দিনে ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়াসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর ও কাউখালি উপজেলা পরিষদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন একাধিক প্রার্থী। বাঘাইছড়িতে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদের চার প্রার্থী, নানিয়ারচরে তিন চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদের সাত প্রার্থী এবং কাউখালিতে এক চেয়ারম্যান প্রার্থী উপজেলা ভোট বর্জন করেন।পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে সোমবার সকাল ৮টায় দেশের ১৫ জেলার ১১৬ উপজেলায় ভোট শুরুর পর থেকে ভোটবর্জনের ঘোষণা আসতে থাকে। বাঘাইছড়ি: বাঘাইছড়ি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে বর্তমান চেয়ারম্যান পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সমর্থিত বড়ঋষি চাকমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন সাবেক চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা। বড়ঋষি চাকমা জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের নেতা।

আর সুদর্শন জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) অংশের কেন্দ্রীয় ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বাঘাইছড়িতে প্রার্থী না দেওয়ায় দুই আঞ্চলিক দলের মধ্যেই চলছে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা।বড় ঋষি চাকমা বলেন, “গতকাল রাতেই বিভিন্ন কেন্দ্রে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ব্যালট বাক্সে ভরা হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে আমার সমর্থক ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে।” তিনি বলেন, “আমার প্রতিপক্ষ বিপুল সংখ্যক বহিরাগত ও সশস্ত্র কর্মী নিয়ে এলাকায় ভোটসন্ত্রাস করলেও প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় আমি ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলাম। আমার সাথে তিনজন ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীও নির্বাচন বর্জন করছেন।” এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে রাঙামাটির রিটার্নিং অফিসার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এসএম শফি কামাল বলেন, “বাঘাইছড়িতে একজন চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ও একাধিক ভাইস চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা আমরা শুনেছি। অন্য উপজেলাগুলোতে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট চলছে। কোথাও কোনো অভিযোগ আমরা পাইনি।” বড় ঋষি চাকমা লিখিত অভিযোগ করলে তা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানান রিটার্নিং অফিসার শফি।এদিকে সকালে রাঙামাটি সদরের বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের উপস্থিতি একেবারেই কম। পৌর এলাকায় রিজার্ভবাজারের কেন্দ্রগুলোতে ছোটোখাটো লাইন দেখা গেলেও তবলছড়ি এলাকার তিনটি কেন্দ্র সকাল সাড়ে ৯টার দিকেও প্রায় ফাঁকা ছিল। এ উপজেলায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সমর্থিত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান অরুণ কান্তি চাকমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মো. শহীদুজ্জামান রোমান। সকালে শহরের কেন্দ্রগুলোতে আওয়ামী লীগের কর্মীদের উপস্থিতি দেখা গেলেও রিজার্ভবাজার ও তবলছড়ির কেন্দ্রগুলোতে অরুণ কান্তির আনারস প্রতীকের কোনো এজেন্ট দেখা যায়নি।

কাউখালী: কাউখালির চেয়ারম্যান পদে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি সমর্থিত অর্জুন মনি চাকমার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের সামশু দোহা চৌধুরী। সামশুর বিরুদ্ধে ‘নির্বাচনে অনিয়ম, জালভোট, এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া এবং তার ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়ার’ অভিযোগ এনে বেলা ১২টার দিকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান অর্জুন। সামশুর সমর্থকদের বিরুদ্ধে ‘ব্যাপক জালভোট’ দিয়ে নির্বাচনের শৃংঙ্খলা ও বিধি লঙ্ঘন করার অভিযোগ তুলে পুনর্নির্বাচনেরও দাবি জানান তিনি। অর্জুন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোয় এ উপজেলায় নৌকার প্রার্থী ছাড়া আর কোনো প্রার্থী রইল না অর্জনের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কাউখালি উপজেলা নির্বাহী অফিসার শতরূপা তালুকদার বলেন, “নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর হচ্ছে এবং কেন্দ্রে কেন্দ্রে বিপুল ভোটার উপস্থিত রয়েছে। তবুও তিনি কেনো অভিযোগ করে সরে গেলেন বুঝতে পারছিনা।” নানিয়ারচর নানিয়ারচরে জনসংহি সমিতির (এমএন লারমার) সমর্থিত চেয়ারম্যান প্রার্থী রূপম দেওয়ান এবং একই পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী জোন্তিনা চাকমা ও পঞ্চানন চাকমা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। নানিয়ারচর উপজেলায় পাঁচ প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। এদের মধ্যে রূপম ও বর্তমান চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা দুই জনই পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) সমর্থিত। এই উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে জাতীয় দলগুলোর কোন প্রার্থী নেই।

রূপমের অভিযোগ, “রাতেই বেশিরভাগ কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে গেছে।এখন আমরা ও আমাদের ভোটাররা কেন্দ্রেই যেতে পারছিনা। তাই সঙ্গত কারণেই নির্বাচনে থাকার কোন মানে নেই। তাই আমিসহ তিন চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং চার ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী বর্জন করে নির্বাচন থেকে সরে গেলাম।” একই সময় ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী রন বিকাশ চাকমা, সুজিত তালুকদার, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান কোয়ালিটি চাকমা ও কণিকা চাকমা ও এ সময় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ভোট বর্জনের ঘোষণার পর তারা নানিয়াচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মাসউদ পারভেজের কাছে নির্বাচন স্থগিতের জন্য আবেদন জানান। মাসউদ বলেন, তিন চেয়ারম্যান ও চার ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থী নির্বাচন স্থগিত করার জন্য যে আবেদন জমা দিয়েছেন তা রিটার্নিং অফিসারকে জানানো হয়েছে। রাঙামাটির রিটার্নিং কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) এসএম শফি কামালের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঘটনাটি তিনি শুনেছেন।

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *