ব্র্যান্ডস ফিউচার গ্রুপ নামের একটি পশ্চিমা গবেষণা সংস্থার রিপোর্টে বলা হয়েছে, পশ্চিমা নাগরিকরা, বিশেষ করে তাদের মধ্যে যারা আধুনিক ও জীবনধারায় নতুনত্বের ছোঁয়া লাগানোর প্রত্যাশী তারা ধর্মের দিকে ঝুঁকছেন। এমনকি পশ্চিমের প্রতিভাবান ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মধ্যেও অনেকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন।

খ্যাতিমান অনেক ক্রীড়াবিদ বা খেলোয়াড় শ্রেণীও এর অন্তর্ভুক্ত। বিশ্বসেরা মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মাদ আলী নামটি এতই জনপ্রিয় যে তিনি যে এক সময় ক্যাসিয়ুস মার্সিয়ুস ক্লে বা খ্রিস্টান ছিলেন তা খুব কম মানুষই জানেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি হেভিওয়েট মুষ্টিযোদ্ধাদের মধ্যে শীর্ষস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। ৫৬টি প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে মুষ্টিযুদ্ধের ইতিহাসে নিজ নামকে অক্ষয় করে রেখেছেন নও-মুসলিম মুহাম্মাদ আলী।

কিংবদন্তীতুল্য মুষ্টিযোদ্ধা মুহাম্মাদ আলী ১৯৬৪ সালে মুসলমান হন। ইরাক ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রবল বিরোধিতাকারী এই বিপ্লবী খেলোয়াড় কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন মুসলমানদের নেতা ম্যালকম এক্সের অন্যতম প্রধান সহযোগী ও সহকর্মী ছিলেন। ম্যালকম এক্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ বা বর্ণবৈষম্য ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন।

মুহাম্মাদ আলীর মতে, ইসলামের প্রতি তাঁর আকৃষ্ট হওয়ার প্রধান কারণ ছিল, বঞ্চিত ও দুর্বলদের প্রতি এ ধর্মের সমর্থন এবং অবিচারের বিরুদ্ধে এর সংগ্রাম।

তারকা খেলোয়াড় ও ফুটবলারদের মধ্যে যারা মুসলমান হয়েছেন ‘ফ্রেডরিক কানুতি’ তাদের মধ্যে অন্যতম। ইসলামের নৈতিক নীতিমালা ও ধর্মবিশ্বাস ইউরোপীয় এই ফুটবলারকে অভিভূত করেছিল।

নও-মুসলিম কানুতি ইউরোপের সু-ইয়া স্পানিয়া ক্লাবসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি ফুটবল ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। তিনি ১৯৭৭ সালের দোসরা সেপ্টেম্বর ফ্রান্সে জন্ম গ্রহণ করেন। ব্যাপক পড়াশুনা ও গবেষণার পর ১৯৯৭ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তিনি ইসলামের ধর্মবিশ্বাসে অবিচল রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে নও-মুসলিম কানুতি বলেছেন: আমি যখনই অবসর পাই তখনই ইবাদতে মশগুল হই। কখনও কখনও আমার সহযোগী খেলোয়াড়রা আমাকে এ অবস্থায় দেখেন। কিন্তু তারা জানেন যে, আমি মুসলমান ও তারা আমার ধর্ম-বিশ্বাসকে শ্রদ্ধা করেন। বেশিরভাগ সময়ই তাদেরকে আমার কাজকর্ম ও ইবাদত সম্পর্কে আগ্রহী দেখা যায়, বিশেষ করে রমজান মাসের সময়। তারা এ সময় আমাকে কিছু খেতে না দেখে বিস্মিত হন এবং এ সম্পর্কে বহু প্রশ্ন করেন। কিন্তু আমি কখনও বিরক্ত বোধ করি না এবং আমি আমার ইবাদতে আনন্দ অনুভব করি।

এক সময়কার গোঁড়া স্প্যানিশ ক্যাথলিক খ্রিস্টান কানুতি মুসলমান হওয়ার পরও তার প্রাত্যহিক জীবন-যাত্রা স্বাভাবিকভাবেই চালিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে ইসলামই তাকে স্বাভাবিক জীবন-যাত্রা চালিয়ে যেতে সহায়তা করছে। কারণ, এ ধর্মের পথই হল স্বাভাবিক ও তা জীবনে প্রশান্তি আনে। ইসলাম নিজের পরিবারকে ও প্রতিবেশীদেরকে ভালবাসতে শেখায়। তাই কানুতির মতে, এটা খুবই অদ্ভুত বিষয় যে মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসী বলে প্রচার করা হচ্ছে, অথচ যে ইসলামকে তিনি চেনেন তার সঙ্গে সন্ত্রাসের রয়েছে বহু যোজন যোজন ব্যবধান।

ইউরোপে যে সময়টায় ফুটবল খেলার মৌসুম শুরু হয় সে সময় রমজানও শুরু হওয়ায় মুসলিম খেলোয়াড়রা সমস্যার সম্মুখীন হন বলে ব্রিটিশ সাময়িকী টাইমের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষকরে স্পেনে এই সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। সেখানকার টিমগুলোর কোচরা মনে করেন, যেসব মুসলিম ফুটবল খেলোয়াড় রোজা রেখে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকেন তাদের খেলার মাঠে নামা উচিত নয়। এ নিয়ে খেলোয়াড় ও কোচদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রতি বছরই অব্যাহত থাকছে। কিন্তু মুসলিম ফুটবলাররা রমজান মাসে রোজা রাখার নীতিতে অবিচল রয়েছেন।

নও-মুসলিম কানুতি রমজানের শুরু থেকেই প্রতিদিন নিয়মিত রোজা রাখেন। আর এ নিয়ে প্রতি বছরই তার ক্লাবের খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। রমজান মাসের বিষয়টি স্পেনের ফুটবল ফেডারেশনের জন্য একটি পরিচিত বিষয়ে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও দেশটির কোনো কোনো ক্লাবের কর্মকর্তা রোজাদার ফুটবলারদের জন্য নানা সমস্যা সৃষ্টি করছেন।

কানুতি রমজান মাসে রোজা রাখা সত্ত্বেও কোনো এক খেলায় দুটি গোল করেছেন। এভাবে তিনি ক্লাবের খাদ্য-পুষ্টি বিশেষজ্ঞকে বুঝিয়ে দেন যে রোজা তার খেলায় কোনো ব্যাঘাত ঘটায় না, বরং রোজা তাকে এ খেলায় আরো বেশি ঝলসে ওঠার প্রেরণা জোরদার করে। তার মতে, “রোজা আমার মধ্যে ধৈর্য ও প্রতিরোধকে জোরদার করে এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্য মনকে শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী করে।”

ক্রীড়াঙ্গনে বা খেলাধুলার জগতে ধর্মীয় অনুভূতি জোরদার হতে থাকায় বিশ্বের বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব ফুটবল ফেডারেশন বা ফিফা সব ফুটবল ফেডারেশনকে এ কথা ঘোষণার নির্দেশ দিয়েছে যে, এখন থেকে যে কোনো দেশের ও যে কোনো জাতির খেলোয়াড় ধর্মীয় পরিচিতিযুক্ত কোনো ততপরতা চালাতে পারবেন না।

নও-মুসলিম কানুতি কোনো এক খেলায় নিজ জার্সিতে কয়েকটি ভাষায় ফিলিস্তিন শব্দটি লিখেছেন যাতে ইহুদিবাদী ইসরাইলের হামলার মোকাবেলায় গাজার মজলুম ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার সমর্থন ফুটে উঠে। ওই খেলায় গোল করার পর গাজাবাসীর প্রতি সমর্থন প্রকাশের জন্য তিনি ওই জার্সিটি প্রদর্শন করেছিলেন। কিন্তু এ জন্য তাকে তিন হাজার ইউরো জরিমানা করা হয় এবং তিনটি ম্যাচে তার অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়।

ওই ঘটনার একদিন পর এ প্রসঙ্গে নও-মুসলিম কানুতি ফরাসি রেডিওকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছেন, গাজার জনগণের ওপর গণহত্যার দৃশ্য থেকে আমি অসাধারণভাবে প্রভাবিত হয়েছিলাম। তাই আমি আমার অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছি। যখন এ ধরনের অবিচার ঘটে তখন প্রতিবাদ জানানোর বা এর বিরুদ্ধে কিছু করার চেষ্টা চালানো বিশ্বের যে কোনো ব্যক্তির দায়িত্ব হয়ে পড়ে। আমি এ কাজের ফল কি হতে পারে সে ব্যাপারে সচেতন ছিলাম শতভাগ এবং পুরোপুরি সচেতনভাবেই এ কাজ করেছি।

স্পেনে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ‘মাহমুদ আল আওনিন’ নও-মুসলিম কানুতির ওই পদক্ষেপের প্রশংসা করে বলেছেন, “কানুতি একজন মুসলমান। কোনো মুসলমান কি অবিচারের ব্যাপারে তার অনুভূতিকে গোপন রাখতে পারেন? তাই তার পদক্ষেপ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। খেলোয়াড়রাও অন্য সব মানুষের মতই তাদের অনুভূতি প্রকাশের অধিকার রাখেন। তারাও তাদের বিশ্বাস ও চিন্তাধারা তুলে ধরার অধিকার রাখেন। আমি নিশ্চিত যে স্পেনের ফুটবল লীগ পছন্দ করেন এমন সব শিশুরাই কানুতির এই পদক্ষেপের জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞ। তিনি এমন কাজ করেছেন যে সব যুগেই তিনি ফিলিস্তিনি শিশুদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। ফিলিস্তিনি শিশুদের অশ্রু তার পৃষ্ঠপোষক। আমি নিশ্চিত যে কানুতির হৃদয় ফিলিস্তিনি ভাইদের পাশেই ও তাদের পক্ষেই স্পন্দিত হচ্ছে। ফুটবল কেবল একটি খেলা নয়। যারা আজ এই বড় বিষয়টিকে উপেক্ষা করে একে খুব সাধারণ একটি খেলা হিসেবে তুলে ধরতে চায় তারা আসলে নিজেকেই প্রতারিত করছেন।”

নও-মুসলিম কানুতি’র মতে, ইসলাম খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও শারীরিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দেয় এবং একইসঙ্গে একজন বিশ্বাসী বা মুমিন ব্যক্তি সমাজে যা ঘটছে সে ব্যাপারে উদাসীন থাকবেন সেই অনুমতি ইসলাম কখনও দেয় না। কানুতি ২০০৬-৭ সালে একটি কোম্পানির লোগো বা মার্কযুক্ত পোশাক পরতে রাজি হননি। তার মতে এ বিষয়টি ইসলামী নীতিমালার বিরোধী।

গত বছর সুইয়া অঞ্চলের মুসলমানরা ভাড়া করা যে বাড়ীটিকে মসজিদ হিসেবে ব্যবহার করত তার মালিকের সঙ্গে চুক্তি নবায়নের সময় কানুতি বাড়ীটিকে কিনে নেন যাতে মুসলমানরা সেখানে নিশ্চিন্তে দয়াময় আল্লাহর ইবাদত বন্দেগি করতে পারেন। এভাবে কানুতি ইসলামের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা প্রদর্শন করেছেন।-প্যারিস টুডে

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *