কুমিল্লার দেবিদ্বারে জুয়া খেলায় সর্বস্বান্ত হয়ে দালালের মাধ্যমে পাঁচ মাস বয়সী এক শিশুসন্তানকে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ওই শিশুর বাবা সেলিম মিয়ার (৪৫) বিরুদ্ধে। চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার জাফরগঞ্জ ইউনিয়নের বারুর গ্রামে। খবর পেয়ে সোমবার ওই বাড়িতে সাংবাদিকরা গেলে এ অভিযোগ করেন সেলিম মিয়ার স্ত্রী বিলকিস বেগম (৩৫)।

তিনি সাংবাদিকদের জানান, তার স্বামী জুয়া খেলার কারণে পরিবারটি এখন প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। তিনি শিশুসন্তানকে ফিরে পেতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাসহ প্রশাসনের নিকট সহায়তা চেয়েছেন।

তবে বিলকিসের স্বামী সেলিম বলছেন, তিনি তার শিশুসন্তানকে বিক্রি করেননি, দত্তক দিয়েছেন। এদিকে এ ঘটনা জানাজানি হলে এলাকায় বেশ তোলপাড় শুরু হয়।

সোমবার ওই বাড়িতে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে সন্তানকে ফিরে পেতে বুকফাটা কান্নায় শিশুর মা বিলকিস বেগম বলেন, আপনারা আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন। আমার সন্তানকে আমার স্বামী একই উপজেলার চরবাকর গ্রামের বলিমন্দের বাড়ির নুরুল ইসলাম নামে এক দালালের মাধ্যমে দুই লাখ টাকায় বিক্রয় করে দিয়েছেন।

তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একটি মাইক্রোবাসযোগে কয়েকজন লোক বাড়িতে আসে। তখন আমার কোল থেকে জোরপূর্বক আমার স্বামী শিশু ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাদের নিকট দিয়ে দেয়। আমি অনেক আকুতি-মিনতি করেও সন্তানকে আগলে রাখতে পারিনি। সন্তানকে কোথায় বিক্রি করেছে আমি জানি না। আমার স্বামী জুয়াড়ি, জুয়া খেলে এখন প্রায় সর্বস্বান্ত। তাই আমার সন্তানকে সে বিক্রি করে দিয়েছে। যেকোনো কিছুর বিনিময়ে হলেও আমি আমার সন্তান ফিরে পেতে চাই।
তবে এ বিষয়ে স্বামী-স্ত্রীর কথা বলার সময় পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া যায়। বিলকিসের স্বামী সেলিম মিয়া বলেন, আমাদের বিয়ে হয়েছে ২২ বছর আগে। এখন অভাবের সংসার। স্ত্রী, পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসারের ভরণপোষণ চালাতে খুবই কষ্ট পেতে হচ্ছে। তাই চরবাকর গ্রামের ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের মাধ্যমে আমার সন্তানকে কুমিল্লায় এক নিঃসন্তান পরিবারের নিকট দত্তক হিসেবে দিয়েছি। তবে আমি কোনো টাকা-পয়সা নিয়ে সন্তানকে বিক্রি করিনি। আমার সন্তান ভালো থাকবে, লেখাপড়া শিখবে, মানুষের মতো মানুষ হবে- এ জন্যই দত্তক দিয়েছি।

ওই শিশুকে কোথায় ও কার নিকট সন্তান দত্তক দেয়া হয়েছে? জানতে চাইলে শিশুর বাবা সেলিম মিয়া বলেন, সন্তান বিক্রি করা হয়নি। পরিবারের সম্মতি নিয়েই দেবিদ্বার উপজেলার চরবাকর গ্রামের নুরুল ইসলামের মাধ্যমে কুমিল্লা শহরের এক নিঃসন্তান শিক্ষক পরিবারের নিকট সন্তানকে দত্তক দিয়েছি। তবে দত্তক নেয়া পরিবারের পরিচয় জানি না, এমনকি নামও জানি না। তবে একটি মোবাইল ফোন নম্বর দিয়ে বলেন, আমার নিকট এটাই আছে।

পরে ওই মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে জানা যায় ভিন্ন কথা। পরিচয় জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, আমি এ বিষয়ে কিছুই জানি না, আমি কারও কোনো সন্তান নেইনি, যারা নিয়েছে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। আমার নাম শামিম আহমেদ, আমি পেশায় একজন শিক্ষক।

শামিম আহমেদ জানান, তার কোনো সন্তান নেই। একটি সন্তানের খোঁজে আছেন অনেক দিন। তাই তার এক ছাত্র একটি সন্তানের খোঁজ দেন। পরে ওই ছাত্র তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। তার মা ও তার ভাই দেবিদ্বার উপজেলার চরবাকর গ্রামের নুরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।

শামিম আহমেদ আরও বলেন, নুরুল ইসলাম ওই শিশুটির সন্ধান দেন এবং বাচ্চা নিতে হলে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে জানান। এত টাকা দিয়ে বাচ্চা কেনার সামর্থ আমার ছিল না। পরে আরও একটি ধনাঢ্য নিঃসন্তান পরিবারের বাচ্চার প্রয়োজন হলে ওই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করি।

তিনি বলেন, ওরা গত ১৬ মার্চ এসে বাচ্চা দেখে পছন্দ করেন এবং কথাবার্তা শেষে গত ২৯ মার্চ ৩০০ টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের মাধ্যমে কিছু শর্ত সাপেক্ষে তিনজন সাক্ষীর স্বাক্ষর নিয়ে দুই লাখ ৫৫ হাজার টাকা পরিশোধ করে বাচ্চা নিয়ে যায়।

তবে শামিম আহমেদ ওই পরিবারের পরিচয় দিতে অপারগতা জানালেও একপর্যায়ে বাচ্চা গ্রহীতার নাম মঞ্জু, তিনি চট্টগ্রামে অডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন বলে জানান। তিনি আরও জানান, বাচ্চাটি ভালো থাকবে, ওই পরিবার বিশাল সম্পদের মালিক। ভবিষ্যতে সবকিছুরই মালিক হবে ওই শিশুটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই বাড়ির কয়েকজন নারী সাংবাদিকদের বলেন, বাচ্চা বিক্রি করে দেয়ার সংবাদ পেয়ে আমরা বাচ্চাটিকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি, কিন্তু পারিনি। সেলিম মিয়া আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে এবং তার স্ত্রীকে মারধর করে বাচ্চাটিকে নিয়ে যায়। ওই সময় বাড়িতে তাকে বাধা দেয়ার মতো কোনো পুরুষ মানুষও ছিল না।

বাড়ির লোকজন জানান, সেলিম ও বিলকিস দম্পতির পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে বড় ছেলে সবুজ (২০) গ্রামের বাড়িতে থেকে সিএনজি চালায়, আকাশ (১৭) চট্টগ্রামে দাদা-দাদি ও চাচার সঙ্গে থেকে সিএনজি চালায়, সাগর (১৪) স্থানীয় একটি দোকানের কর্মচারী, চতুর্থ ছেলে শাওন (৯), একমাত্র মেয়ে সাথী (১২) স্থানীয় বারুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে এবং পঞ্চম পাঁচ মাস বয়সী শিশু ইয়াছিনকে বিক্রি করে দেয়া হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার লোকজন বলেন, দেবিদ্বার উপজেলার বারুর ও পোনরা গ্রামে জুয়াড় আসর বসে। সেলিম একজন জুয়াড়ি। সে আয়ের অধিকাংশ টাকাই জুয়া খেলে শেষ করে। জুয়া খেলে সে অনেক টাকা ঋণগ্রস্ত হয়েছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিষয়টি আমি শুনেছি, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমি সকলের সঙ্গে কথা বলে শিশুটিকে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করব।

দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রবীন্দ্র চাকমা সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে কেউ এখনো কোনো অভিযোগ করেনি। বিষয়টি এখন শুনেছি, তদন্তপূর্বক বাচ্চা উদ্ধারসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *