‘আমি সবকিছুই বাদ দিলাম। শুধু একটাই প্রশ্ন, শুধু বলেন, ছেলে আমাকে মারবে কেন? গায়ে হাত তুলবে কেন?’
এ কথা বলেই কেঁদে ফেললেন ৭৭ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা শাহজাহান আলী। তাঁর অভিযোগ, ছেলে মেজবাহ উদ্দিন প্রায়ই তাঁকে মারধর করেন। এই বয়সে শরীর এবং মনে সে মার সহ্য করতে পারছেন না। ছেলে কেন মারবে—এর বিচার চান তিনি।
গত মাসে এই বাবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর এক চিঠিতে লিখেছেন ছেলের এই মারধরের কথা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঠিকানায় পাঠানো হয় সে চিঠি। ছেলে তাঁকে শুধু কিল, ঘুষি, লাথিই মারেন না, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন, জীবননাশের হুমকি দেন এবং আর্থিকভাবে চাপের মধ্যে রাখারও অভিযোগ করেন তিনি। এই বাবা তাঁর নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দ্বিতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ছেলের বিরুদ্ধে একটি দেওয়ানি মামলা করেন এই বাবা। একই মাসে মিরপুর মডেল থানায় এই ছেলের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি করেছেন। সেখানেও ছেলের মারধর ও বাড়ির ভাড়াটেদের কাছ থেকে সব ভাড়া তুলে নিয়ে যান বলে অভিযোগ করেন।
এই বাবা প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে যখন ছেলের বিভিন্ন কার্যকলাপের কথা বলছিলেন, তখন তাঁর চোখ দিয়ে পানি গড়াতে থাকে। শাহজাহান আলী জানালেন, তাঁর প্রথম স্ত্রী মারা গেছেন সাড়ে তিন বছর আগে। তারপর এক বছর আগে তিনি আরেক বিয়ে করেছেন। এই বিয়ের কাজে মেজ ছেলেই সহযোগিতা করেন। তবে বিয়ে করার কয়েক মাস পর থেকেই শাহজাহান আলীর দ্বিতীয় স্ত্রীকে ফোন করে গালিগালাজ করছেন। অ্যাসিড মারার হুমকি দিচ্ছেন। ঘরে ঢুকে যখন শাহজাহান আলীকে মারধর করেন, তখন ফেরাতে গেলে কিছু মারধর লেগে যাচ্ছে দ্বিতীয় স্ত্রীর শরীরেও। দ্বিতীয় বিয়ে করার পর থেকে বড় ছেলের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই। মেজ ছেলে (যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ) তিনি ব্যবসা করেন। ছোট ছেলে দেশের বাইরে থাকেন।
রাজধানীর মিরপুরে আড়াই কাঠার একটু বেশি জায়গায় তৈরি ছয়তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকেন শাহজাহান আলী। অন্যগুলো ভাড়া দেওয়া। এই বাড়ি মূলত মেজ ছেলের কারণে তিন ছেলেকে রেজিস্ট্রি করে লিখে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন শাহজাহান আলী। হাউস বিল্ডিংয়ের কাছ থেকে লোন নিয়ে করা বাড়ির ২০ লাখ টাকা লোন পরিশোধ করার বাকি আছে। বর্তমানে মেজ ছেলে বাড়ির ভাড়াটেদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন তাই এই লোন শোধ করতে পারছেন না বলে জানালেন শাহজাহান আলী। তিনি ছেলেদের লিখে দেওয়া দলিল বাতিলের দাবি জানিয়ে মামলা করেন। মামলায় মূলত মেজ ছেলেকে দলিল লিখে নেওয়ার বিষয়ে দায়ী করা হয়েছে। বর্তমানে এই মামলা তুলে নেওয়ার জন্যই ছেলে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছেন বলে জানালেন শাহজাহান আলী।
প্রায় ২০ বছর আগে কৃষি ব্যাংকের সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার পদ থেকে অবসর নেন শাহজাহান আলী। ছেলের মারধর করা প্রসঙ্গে বললেন, ‘ছেলে আমারে রাস্তাতেও মারছে। ঘুরে ঘুরে লাথি মারতে থাকে। হাতের কবজি ভেঙে দিছে। কিন্তু এ কথা কাকে বলব? চিন্তা করে অনেক দিন তা গোপন রাখছি। এখন মানসম্মান, লজ্জার কথা চিন্তা করি না। জীবনের চেয়ে মানসম্মান তো বড় না।’
এই মেজ ছেলেও মিরপুরে কাছাকাছিই থাকেন। শাহজাহান আলী বলেন, ‘ছেলে এখন আমার শত্রু। সব সময় পেরেশানিতে রাখে। ও বলেই দিয়েছে—আমার মৃত্যু নাকি তার হাতে।’
ছোটবেলা থেকেই মেজ ছেলে পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন না। ব্যবসা করার জন্য শাহজাহান আলী বেশ মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছিলেন, ছেলে তা সব নষ্ট করে ফেলেন বলেও অভিযোগ এই বাবার। জানালেন, এর আগে এক বছরে দুইবার ছেলে মারধর করলে এ অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে ছেলে টাকাপয়সা দিয়ে থানার লোকজনকে ম্যানেজ করে ফেলেন।
শাহজাহান আলী বলেন, ‘আমার বড় ছেলেও খারাপ, তবে সে কখনোই আমার গায়ে হাত তোলে না। আর ছোট ছেলে তার মেজ ভাইয়ের ভয়ে কিছু বলতে পারে না।’
মেজবাহ উদ্দিনের এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য অসংখ্যবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে তিনি তাঁর দুটো মুঠোফোনই বন্ধ করে দেন।

Related Post

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •