মেরাজ শব্দের অর্থ সিঁড়ি, সোপান। ইসলামী পরিভাষায় মহানবী (সা.)-এর হিজরতপূর্ব মক্কা জীবনে পঞ্চম/ষষ্ঠ/সপ্তম হিজরি সনের ২৬ রজব দিবাগত রাতে উম্মে হানি (রা.)-এর ঘর থেকে কাবা ঘরে এসে প্রথম পর্বে বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদ পর্যন্ত সফর, দ্বিতীয় পর্বে জেরুজালেমস্থ বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে আরশে আজিম’ পর্যন্ত সফর। তবে প্রথম পর্বকে ‘ইসরা’ বলা হয় আর দ্বিতীয় পর্বকে বলা হয় ‘মেরাজ’। যেমন আল কোরআনে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রজনীতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন। মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার পরিবেশ আমি করেছিলাম বরকতময়, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য; তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (১৭/১)।

উক্ত আয়াতে এই সফরের প্রথম পর্ব যাকে ‘ইসরা’ বলা হয় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ রাতের বেলা প্রিয় নবীকে মক্কা নগরী থেকে জেরুজালেমে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারপর ‘ইসরা’ পর্ব শেষে মহাকাশে গমন। বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রিয় নবী (সা.)-এর ইমামতিতে সব নবী দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। ধরাধামে আগমনকারী মহানবী (সা.) পৃথিবী থেকে মহাকাশে গমনকারী ও আল্লাহর দর্শন লাভকারী হিসেবে বিদায় অভিনন্দন জ্ঞাপন করতে সব আম্বিয়ায়ে কিরাম এখানে সমবেত হয়েছিলেন।

মক্কার মুশরিকরা এই সফরের প্রথম পর্ব (অর্থাৎ মক্কা থেকে জেরুজালেম) তখনকার দিনের যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অবাস্তব মনে করেছিল। কারণ যে ক্ষেত্রে এক সপ্তাহ লাগার কথা সেখানে এক রাতে কীভাবে সম্ভব! তাই তারা এদিক-সেদিক কথা বলা আরম্ভ করে দেয়। হজরত আবু বকর (রা.)-কে ডেকে বিভ্রান্তিমূলক কথা বলতে থাকে। তিনি অকপটে বলে দিলেন যে, আমার নবী (সা.) বলে থাকলে এ কথা অবশ্যই সত্য। এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই তাকে সিদ্দিকী উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে শুরু হওয়া সফরের দ্বিতীয় পর্বে জেরুজালেম থেকে আরশ পর্যন্ত মহাকাশ, ঊর্ধ্বাকাশ সফরের যে বিবরণ খোদ নবী (সা.)-এর জবানিতে বা সাহাবিদের বর্ণনায় বিবৃত হয়েছে সেসব ঘটনা ও দীক্ষা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। যেমন ধরুন ‘বুরাক’ নামক বাহনে চড়া, আকাশসমূহ পরিভ্রমণ করা, প্রত্যেক আকাশে ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা, কোন্ নবীকে দেখতে কেমন লেগেছে সে বিবরণ, তাদের বক্তব্য শ্রবণ, বিভিন্ন আজাবে গ্রেফতার হওয়া লোকের দর্শন, জান্নাত, জাহান্নাম দেখা, লওহ কলম, সিদরাতুল মুনতাহা, সেথায় ফেরেশতাদের সাজসজ্জা, আচার-আচরণ, সম্ভাষণ, আরশ-কুরসি দর্শন, আল্লাহর দিদার লাভ, কথোপকথন, হাদিয়া পেশ, নামাজ-রোজার বিধান লাভ, হজরত মূসা (আ.)-এর সঙ্গে বার বার দেখা-সাক্ষাৎ, তাঁর অনুরোধে বার বার ফিরে ফিরে আল্লাহর দরবারে গমন ইত্যাদি ঘটনা অকাট্য প্রমাণে প্রমাণিত।

এ ক্ষেত্রে খোঁড়া যুক্তির আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। এসব বিষয় বিশ্বাস করতে যদি আমরা ইলমে ওহির ওপর নির্ভর করি তাহলেই তৃপ্তি পাব, প্রশান্তি পাব। হজরত আবু বকর (রা.)-এর মতো চোখ বন্ধ করে বলে দেব এ সবই সত্য, সবই বাস্তব, সবই সঠিক। যারা তৎকালীন যোগাযোগমাধ্যমের ওপর ভর করে ‘ইসরা’র সফরকে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিল। তারা রাতের ওই সফরকে মিথ্যা বলে প্রচার করেছিল। বর্তমানে যারা হাদিস ও কোরআন তথা ইলমে ওহিতে অকপট বিশ্বাসী হতে পারেনি তাদের জন্য এই ঘটনাকে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট পরিমাণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও মহাকাশযাত্রা সম্পন্ন হয়েছে। যার ওপর ভর করে মেরাজের ঊর্ধ্বযাত্রা অনুমান করা যায়। সেদিনের মক্কাবাসী মানুষ যেমন যোগাযোগ বাহনের গতির ওপর অনুমান করে বলে দিয়েছিল মক্কা থেকে জেরুজালেম মাত্র এক রাতে গমন ও প্রস্থান করা অসম্ভব। যদিও বর্তমানের বাহন গতি এটাকে অসম্ভব মনে করে না।

তদ্রূপ ধরাধাম থেকে ঊর্ধ্বজগতের সফর পর্ব এক রাতে সম্পন্ন হওয়া বর্তমানের বাহনগতি অসম্ভব মনে করতে পারে। কিন্তু একদিন হয়তো এমন বাহন আবিষ্কার হবে যাতে আরোহণ করে ঊর্ধ্বাকাশ নিমেষেই পাড়ি দেওয়া যাবে। তাই মুমিন হিসেবে এ বিশ্বাস স্থাপন করা অবশ্য কর্তব্য। তবে বিজ্ঞান যদি উন্নতি করতে পারে তাতেও একজন মুমিনের অবশ্যই মেরাজের প্রতি বিশ্বাস করা উচিত। কারণ এই বিশ্বজগৎসমূহের মহান স্রষ্টা এই ঘটনার অনুঘটক। তিনিই মানুষের মেধায় এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের থিম সৃষ্টি করে দিয়েছেন।

আসলে পৃথিবীর অন্তিম শয়ানে বিজ্ঞানের বহুমাত্রিক আবিষ্কার সংঘটিত হবে বলেই পৃথিবীতে শুভাগমনকারী আম্বিয়াদের সুমহান ধারার সবশেষ সত্তা শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ করে, সব নিদর্শন দর্শন করে মানব-সম্মুখে উন্মোচন করা হয়েছে। যাতে বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাধারী মানুষ ইসলামকে ও ইসলামের নবীকে সেকেলে বলে উড়িয়ে দিতে না পারে। লক্ষ্য করুন, ওইদিন প্রিয় নবীর বাহন ছিল ‘বুরাক’। ‘বুরাক’ শব্দ বারকুন থেকে উদগত। যার অর্থ বিদ্যুৎ। বিজ্ঞান বিদ্যুৎ আবিষ্কারের বহু আগেই এই বিদ্যুতের খবর কোরআন -হাদিস পরিবেশন করেছে।

প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, ‘পানিতে আগুন রয়েছে’। তখন মানুষ বুঝতেও পারেনি পানিতে আবার আগুন কীভাবে বিদ্যমান থাকে। বিদ্যুৎ আবিষ্কার সেই তথ্য বাস্তবানুগতভাবে প্রকাশ করে দিয়েছে।

লেখক : পেশ ইমাম

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ

আজ পবিত্র শবে মেরাজ। আজ থেকে পনের শত বছর আগে আল্লাহ পাক তার হাবিব (সাঃ)মক্কার জমিন থেকে দিদার দেওয়ার জন্য আরশ আজিমে নিয়ে যায়। সেখানে আল্লাহ পাক পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ উম্মতের জন্য দান করেন। শবে মেরাজের ফজিলত মিরাজুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সসাল্লাম।

শবে মেরাজের আমল: নামায ও রোযা

শবে মেরাজ উপলক্ষে নফল নামাযের নিয়তে দুই রাকআত করে মোট ১২ রাকআত নামায পড়তে হবে। প্রতি রাকআতে সূরা ফাতিহার সাথে অন্য যেকোন সূরা পড়া যাবে।

নামায শেষে…

১০০ বার পড়ুনঃ সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবর।

১০০ বার যেকোন ইস্তেগফার পড়ুনঃ আস্তাগফিরুল্লাহা রাব্বি মিন কুল্লি জাম্বিওঁ ওয়া আতুবু ইলাইহি, লা হাওলা ওয়া লা কুওয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহিল আলিয়্যিল আজিম।’

১০০ বার যেকোন দরুদ শরীফ পড়ুনঃ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিম মাদানিল জুদি ওয়াল কারামি মাম্বাইল ইলমি ওয়াল হিলমি ওয়াল হিকামি ওয়া আলা আলিহী ওয়া আসহাবিহী ওয়া বারিক ওয়া সাল্লিম।

এরপর পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল আল্লাহ পাকের নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের যেকোন কল্যাণকর দো’আ করুন এবং দিনে রোযা রাখুন। ইনশা’আল্লাহ দো’আ কবূল হবে।

(সূত্রঃ কানযুল উম্মাল, খন্ড-১২, পৃষ্ঠাঃ ৩১২-৩১৩, হাদিস নম্বরঃ ৩৫১৭০, এহইয়া উলুমুদ্দীন, বায়হাকী শরীফ, খন্ড-৩, পৃষ্ঠাঃ ৩৭৪, মাসাবাতা বিসুন্নাহ, পৃষ্ঠাঃ ৭০) ১০০ শত বছরের ইবাদতের সওয়াব।

শবে মেরাজের রোযাঃ

হযরত সালমান ফারসী রাদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহু হতে বর্ণিত, নবী করিম সাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, রজব মাসের মধ্যে এমন এক দিন এবং রাত আছে, যা বড় মর্যদাবান। যেই ব্যক্তি ঐ দিনে রোজা এবং রাতে ইবাদত করবে, আল্লাহ পাক তার আমল নামায় ১০০ বছর লাগাতার রোজা রাখা এবং নামায পড়ার সওয়াব দান করবেন।

আর সেই সময়টি হল, রজব মাসের ২৭ তারিখের (শবে মেরাজের) দিন এবং রাত।

সুত্রঃ দুররুল মনসুর, আল জামেয়ুল কবীর, জামেয়ুল আহাদীস ওয়াল ওরাসিল, শুআবুল ঈমান।

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *