একটি শিশুর সাইকেলের নিচে পড়ে তার প্রতিবেশীর মুরগির বাচ্চা। এরপর অপরাধবোধে অনুতপ্ত শিশুটির কাছে যে অর্থ ছিল তা হাতে করেই মুরগির বাচ্চাটি নিয়ে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালে ছুটে যায় সে। ঘটনাটি ভারতের মিজোরাম রাজ্যের।

সম্প্রতি ফেসবুকে ওই শিশুটি সম্পর্কে একটি পোস্ট করেন এক ব্যক্তি। তাতে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট ছেলেটির বাঁহাতে ধরা একটি মুরগির ছানা। আর অন্য হাতে দশ টাকার একটি নোট।

আসলে সে হাসপাতালে এসেছিল ওই মুরগির ছানাটির চিকিত্সা করানোর জন্য। কারণ, তার সাইকেলের ধাক্কায় ওই মুরগির ছানাটিই আহত হয়। তাই আহতের চিকিত্সা করাতেই সে হাসপাতালে আসে।

তার কাছে দশ টাকাই ছিল। তাই হাসপাতালে এসে সে ওই দশ টাকার বিনিময়ে আহত মুরগির ছানাটির চিকিত্সার আর্জি জানায়।

বুধবার ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়াটাইমস.কমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এক ফেসবুক ব্যবহারকারী শিশুটির ছবি শেয়ার করার পর তাৎক্ষণিক তা ভাইরাল হয়ে যায়। ইতোমধ্যে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ শিশুটির ছবি শেয়ার করেছে।

‘১১ তলায় আছি আমাদের বাঁচাও’

আমি তখন ওয়াশরুমে। সাড়ে ১২টা বা পৌনে ১টার দিকে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। বের হয়ে শুনলাম, পঞ্চম কিংবা ষষ্ঠ তলায় আগুন লেগেছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সবাই বের হতে গিয়ে দেখি, বাইরের অবস্থা খারাপ; ধোঁয়ায় ভরে গেছে সিঁড়ির পাশ। অফিসের পেছনের দরজা তো বন্ধ থাকে, তাই ভেতরে তখনো ধোঁয়া ঢোকেনি।

সিঁড়ির অবস্থা দেখে কেউ আর বের হওয়ার সাহস করলাম না। ভবনে বাতাস বের হওয়ারও কোনো জায়গা নেই। তাই সব ধোঁয়া সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে। ২২ তলায় ছাদ। ১১ তলা থেকে ২২ তলা পর্যন্ত যে যাব, ততক্ষণ বাঁচব কি না—জানি না।

পারব না বলে ফিরে এলাম। জারিন (জারিন তাসনিম বৃষ্টি) একটু বেশিই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কান্নাকাটি করছিল খুব। তারপর ওপরে যাওয়ার একটা ঝুঁকি নিল সে। পরে জানতে পেরেছি, ১৫ তলা পর্যন্ত যেতে পেরেছিল। তারপর নিজেকে আর বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি!

অফিসের ভেতরে ফিরে আমাদের সবার অবস্থা খুব খারাপ। নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। স্রষ্টাকে ডাকছিলাম। আর খোঁজ নিচ্ছিলাম, ফায়ার সার্ভিস এলো কি না। তখন একেকজনের অবস্থা অন্যজনের চেয়ে খারাপ। তবু একে অন্যকে পানি দিয়ে, ভেজা রুমাল দিয়ে সাহায্য করছিলাম। যার যতটা জানা আছে, সবাই সেভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিলাম।

বিশেষ করে ভেজা কাপড় মুখে দিয়ে রাখলাম, যেন ধোঁয়া থেকে বাঁচতে পারি। এসব করতে করতেই প্রায় ২টা বেজে গেল। তখন ধোঁয়ার মাত্রা বেড়ে গেল অনেক। দরজার নিচেসহ সামান্যতম ফাঁকা জায়গাগুলো ধোঁয়া ঢুকছিল। আমরা যতটা সম্ভব পানি সংগ্রহ করে রাখলাম।

ধোঁয়ার তীব্রতায় একসময় কাচের দেয়াল ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলাম। সহকর্মী মেহেদী ভাই কাচ ভাঙলেন। এবার নিঃশ্বাস তো নিতে পারছি; কিন্তু আগুন নেভানোর পর ধোঁয়া আরো ওপরে উঠতে শুরু করল। এদিকে আমরা সবার সহযোগিতা চাচ্ছিলাম। সবাই নিজের আত্মীয়-স্বজনকে ফোন করছিলাম। বলছিলাম, ‘১১ তলায় আছি, আমাদের বাঁচাও।’

এমন করতে করতেই আড়াইটা থেকে ৩টা বেজে গেল। এর মধ্যে কয়েকজন সহকর্মী বাঁচার হাল ছেড়ে দিলেন। ওই সময়টায়ই নিজেকে সবচেয়ে বেশি অসহায় লাগছিল আমার। প্রথমে ফোন করে স্বামী সৈয়দ আলী শামসেক জানালাম। মা-ভাইকে টেনশন দিতে চাইনি। পরে ভাবলাম, এখন না বললে হয়তো আর কোনো দিনই কথা হবে না।

তাই মাকে ফোন করে বললাম, ‘আমার জন্য দোয়া করো। যদি বেঁচে ফিরতে পারি, দেখা হবে। সবাইকে দোয়া করতে বইলো।’সহকর্মীদের কেউ কেউ জানালা দিয়ে, এসির পাশ দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলেন। কয়েকজন যেতে পেরেছিলেন, কয়েকজন পারেননি। এর মধ্যে আব্দুল্লাহ ভাই বললেন, ‘আমাদের বের হতে হবেই।’ আবার বাইরে গেলাম।

তাপে কাচগুলো গলে পড়ছে। ধোঁয়ায় কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। সবারই চোখে-মুখে কাপড়। আব্দুল্লাহ ভাই সামনে ছিলেন। তিনি অবস্থা দেখে বললেন, ‘বাইরে যাওয়া যাবে না। সবাই ভেতরে ফিরে যান।’ আমরা ফিরে এলাম, কিন্তু আব্দুল্লাহ ভাই আর ফিরলেন না। কোনো দিনই ফিরবেন না! ততক্ষণে জানালা দিয়ে কালো ধোঁয়ায় অফিস অন্ধকার হয়ে গেছে।

নিঃশ্বাস নেওয়ার অবস্থা নেই। বের হওয়ারও অবস্থা নেই বলে যে যার মতো বসে রইলাম। এর মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা যখন পানি ছিটাচ্ছিলেন, তখন ভিজে থাকার চেষ্টা করলাম। ভাবছিলাম, এভাবে যতক্ষণ বাঁচা যায়! দুই মিনিট পর সেই পানিও বন্ধ হয়ে গেল। তখন হয়তো নিচের দিকে পানি দিচ্ছিলেন তাঁরা।

সোয়া ৩টার দিকে অবস্থা সবচেয়ে খারাপ হলো। কালো ধোঁয়া আর পোড়া জিনিসপত্রের ছাইয়ে ভরে গিয়েছিল চারপাশ। নিজের হাতটা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম না। নিঃশ্বাসের সঙ্গে ছাই ঢুকছিল। পরনের কাপড়, ওড়না নাকে চেপে নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলাম। যত দূর মনে পড়ে, শেষ ৪৫ মিনিট ঠায় বসেছিলাম।

হয়তো আনমনে অপেক্ষা করছিলাম মৃত্যুর! সাড়ে ৪টার দিকে কেউ একজন বললেন, ‘আমাদের রুমটার পাশে চলে আসো, সেখানে ধোঁয়া কম।’ ওই দিকে গিয়ে দেখি, ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা আমাদের নামানো শুরু করেছেন।

এর মধ্যে দুয়েকজন অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। তাঁদের কোনো রকমে জ্ঞান ফিরিয়ে নামানো হলো। আমাকে নামানোর পর নেওয়া হলো গুলশানের শাহাবুদ্দিন হসপিটালে। বড় ধরনের কোনো ইনজুরি হয়নি। তবে ধোঁয়াটা যেন কলিজায় ঢুকে গেছে! আমি তো বেঁচে গেলাম, কিন্তু এই আগুনে পাঁচ সহকর্মীকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেছি।

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *