বনানীর এফ আর টাওয়ারে দুর্ঘটনার কবলেপড়া মানুষদের উদ্ধার করতে গিয়ে আহত ফায়ার সার্ভিস কর্মী সোহেল রানাকে বাঁচানো গেল না।

সিঙ্গাপুরের জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার (০৭ এপ্রিল) বাংলাদেশ সময় রাত ২টা ১৭ মিনিটে রানার মৃত্যু হয় বলে জানান ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) মেজর শাকিল নেওয়াজ।

এদিকে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার সোহেলের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। প্রিয় সন্তানের অকাল মৃত্যুতে বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন সোহেলের মা হালিমা খাতুন, কিছুতেই কান্না থামছে না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তিকে হারিয়ে বিপদের মুখে পড়েছে পরিবারটি।

জানা গেছে, ইটনা উপজেলার চৌগাঙ্গা ইউনিয়নের কেরুয়ালা গ্রামের দরিদ্র কৃষক নূরুল ইসলাম ও মোছা হালিমা খাতুনের ৪ ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সোহেল রানা ছিলেন সবার বড়। মাত্র তিন বছর আগে ফায়ার সার্ভিসে ফায়ারম্যান হিসেবে চাকরি নেন তিনি। গত ২৩ মার্চ সবশেষ বাড়ি এসেছিলেন সোহেল রানা। সেদিন ঢাকায় যাওয়ার সময় মাকে বলেছিলেন ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে খুব শিগগির বাড়ি আসবেন। তবে এবার তিনি জীবন থেকেই নিলেন লম্বা ছুটি। প্রিয় সন্তানের মৃত্যু খবরে তাই বুক চাপড়ে মাতম করছেন মা-বাবাসহ স্বজনরা।

আরো জানা গেছে, নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা সোহেলের পরিবারের। একটি টিনের দোচালা ঘরে বাবা-মা চাচা-চাচিসহ সবাই থাকেন গাদাগাদি করে। বাবা দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসড। বাড়ির পাশের চৌগাঙ্গা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে এসএসসি পাস করেন। কিন্তু টাকার অভাবে লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না সোহেল রানার। তাই অটোরিকশা চালিয়ে আর প্রাইভেট পড়িয়ে করিমগঞ্জ কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন ২০১৪ সালে। পরের বছরেই যোগ দেন ফায়ার সার্ভিসে। তার আয়েই চলতো পরিবারের ভরণপোষণ ছাড়াও ছোট ভাইদের লেখাপড়া। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন স্বজনরা।

এলাকাবাসী জানান, সোহেল রানা অত্যন্ত বিনয়ী স্বভাবের ছিলেন। বাড়ি এলে আশপাশের লোকজনের খোঁজখবর নিতেন।

চৌগাঙ্গা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খলিলুর রহমান জানান, ছেলেটি খুবই অমায়িক ছিল। পরিবার দরিদ্র হওয়ায় আমরা তাকে লেখাপড়ায় সহযোগিতা করেছি। চাকরি পাওয়ার পর বাড়ি এলেই স্কুলের খোঁজখবর নিত।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে আটকাপড়া মানুষদের ল্যাডারের মাধ্যমে নামাচ্ছিলেন রানা। কিন্তু বাস্কেট বেশি উঠে যাওয়ায় আহতদের নামানো যাচ্ছিল না। সোহেল রানা তখন মই বেয়ে নামতে যান। কিন্তু ওই অবস্থায়ই মই চলতে শুরু করলে রানার ডান পা আটকে গিয়ে কয়েক জায়গায় ভেঙে যায়। সেফটি বেল্টের চাপে পেটের একটা অংশও থেঁতলে যায়।

দুর্ঘটনার পরপরই সোহেল রানাকে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়। সেখানে প্রতিদিন চার ব্যাগ রক্ত দেওয়া হলেও প্রত্যাশা অনুযায়ী উন্নতি হচ্ছিল না। পেটের ক্ষতের কারণে সমস্যা হচ্ছিল রানার। সে কারণে সিএমএইচের চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে পাঠানো হয় সিঙ্গাপুরে।

Related Post

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *