দরুদ ছাড়া সালাত আদায় করলে তা আল্লাহ কবুল করেন না। আর দরুদের মাধ্যমে আখেরি নবী হযরত মুহাম্মাদ (দ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর সালাম প্রেরণ করা হয়ে থাকে। কারবালায় প্রকৃত ইসলাম ও ভণ্ডামীর পার্থক্য দেখানো মহাবিপ্লবের রূপকার ইমাম হুসাইন (আ.) হচ্ছেন আখেরি নবীর (দ.) মহান বংশধর। খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতিমা (সালামুন আলাইহা) ও আমীরুল মুমিনিন হযরত আলীর (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু) দ্বিতীয় এই পুত্র হিজরি চতুর্থ সনের ৩ শাবান ভূপৃষ্ঠে আগমন করেন।

আহলে সুন্নাতের প্রখ্যাত আলেম আল্লামা আবু বকর জাসসাস তাঁর ‘আহকামুল কোরআন’ গ্রন্থে এবং শাইখ আবদুল হক মুহাদ্দিস দেহলভী তাঁর ‘রাহাতুল কুলুব’ গ্রন্থে মহানবীর (দ.) আহলে বাইতের সদস্যদের নামের পাশে ‘আলাইহিস সালাম’ (তাঁর ওপর শান্তি বর্ষিত হোক) এবং অন্যান্য সাহাবীদের নামের পাশে ‘রাযিআল্লাহু আনহু’ (তাঁর ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট) কথাটি ব্যবহার করেছেন। যেভাবে হযরত মারিয়াম (আ.), হযরত লুকমান (আ.) ও ফেরেশতাদের নামের শেষে ‘আলাইহিস সালাম’ ব্যবহার করা হয়, তাঁরা নবী না হওয়া স্বত্বেও। ইমাম হুসাইন (আ.) হচ্ছেন মহানবীর (দ.) আহলে বাইতের ৫ম সদস্য।

মহান আল্লাহ (সুবাহান ওয়া তা’আলা) পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন-

قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَٰ

বলুন (হে নবী), আমি তোমাদের থেকে এর (রিসালাত) বিনিময়ে কোনও প্রতিদান চাই না, শুধু আমার নিকটতম স্বজনের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া (সূরা-শুরা, আয়াত ২৩)

তাফসিরে এসেছে, এই আয়াতে কুরবা বা নিকটতম স্বজন বলতে রাসুলের রক্তজ স্বজনের কথা বলা হয়েছে। যা রাসুলের কন্যা ফাতিমা (সা.আ.) ও তাঁর পরিবারকে ইঙ্গিত করে, রাসুলের (দ.) স্ত্রীদের নয়। কেননা, স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্ক তালাকের মাধ্যমে খতম করা সম্ভব, অন্যদিকে রক্তের সম্পর্ক অস্বীকার করা নাজায়েজ।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাযি.) বলেন-

আমি মহানবীকে (দ.) জিজ্ঞাসা করলাম যে, আপনার যেসব আত্মীয়কে ভালোবাসা আমাদের জন্যে ওয়াজিব, তাঁরা কারা? মহানবী (দ.) বললেনঃ “তাঁরা হলেন আলী, ফাতিমা, হাসান ও হুসাইন। (ইয়ানাবী-উল-মুয়াদ্দাহ্‌, পৃষ্ঠাঃ ৩১১)

বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন-

إنّى تارِكٌ فِيكُمْ الثَقْلَيْنِ کِتَابَ اللهِ و عِتْرَتِی أَهْلَ بَيْتِی إنْ تَمَسَّکْتُمْ بِهِمَا لَنْ تَضِلُّوا أبَداً

আমি তোমাদের জন্য অতি মূল্যবান দুটি বস্তু রেখে যাচ্ছি। একটি হচ্ছে আল্লাহর কিতাব, আরেকটি হচ্ছে আমার রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়, আমার আহলে বায়েত। তোমরা যদি এ দুটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধর তবে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।

এ হাদিসটি সামান্য শব্দের তারতম্যভেদে বিভিন্ন বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে- সহিহ মুসলিম, ৭ম খণ্ড, পৃ:-১২২, দারুল যিল, বৈরুত; সহিহ তিরমিযি, ৫ম খণ্ড, পৃ:-৬৬৩, বৈরুত; মুসনাদে আহমাদ, ৩য় খণ্ড, পৃ:-১৪, বৈরুত; কানযুল উম্মাল, ১ম খণ্ড, পৃ:-১৮৭; মুসতাদরাকে হাকেম, ৩য় খণ্ড, পৃ:-১৪৮, বৈরুত।

ইমাম হুসাইন (আ.) ছিলেন রাসুলের (দ.) আহলে বায়েত বা নবী পরিবারের সদস্য, যে পরিবার পবিত্র ও পাপমুক্ত। মহান আল্লাহ (সু.ও.তা.) ইরশাদ করেন-

إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا

হে নবীপরিবার! আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের মধ্য থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। (সূরা আহযাব, আয়াত ৩৩)

উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা (সা.আ.) বর্ণনা করেন, এই আয়াতটি আমার গৃহে অবতীর্ণ হয়। এই সময় আলী, ফাতিমা, হাসান, হোসাইন এই চারজন আমার গৃহে উপস্থিত ছিলেন। রাসূল (দ.) এই চারজনকে চাদরে জড়িয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহ, এরাই আমার আহলে বায়েত’।

এ প্রসঙ্গে আরো বর্ণিত আছেঃ মহানবী (দ.) যখন উপরিউক্ত চারজনকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করছিলেন, তখন হযরত উম্মে সালামা (সা.আ.) বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমিও কি এই দলের (অর্থাৎ আহলে বায়েতের) অন্তর্ভুক্ত নই?’ এর জবাবে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, ‘না, তবে তোমার নিজস্ব বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।’ (সূত্র : আল্লামা সুয়ূতি প্রণীত ‘তাফসীরে দুররে মানসূর’)

ইমাম হুসাইন (আ.) প্রকৃত মুমিনদের ওপর যে গভীর প্রভাব রাখবেন সে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন স্বয়ং বিশ্বনবী (দ.)। তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে হুসাইনের শাহাদতের ব্যাপারে এমন ভালোবাসা আছে যে, তার উত্তাপ কখনো প্রশমিত হয় না। (মুস্তাদরাক আল-ওয়াসাইল, খণ্ড-১০, পৃষ্ঠা-৩১৮)

হুসাইনের (আ.) কান্নায় মহানবী (দ.) বিচলিত ও ব্যথিত হতেন : মহানবীর (দ.) ঘর হযরত ফাতেমার (সা.আ.) ঘরের পাশেই ছিল। একদিন মহানবী (দ.) ঘর থেকে বের হয়ে ফাতেমার (সা.আ.) ঘরের দরজায় আসলেন। মহানবী (দ.) হুসাইনের (আ.) কান্নার শব্দ শুনলেন। রাসূলের (দ.) পক্ষে হযরত ফাতেমার (সা.আ.) ঘর অতিক্রম করা সম্ভব হলো না। তিনি কিছুক্ষণের জন্য সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লেন এবং হযরত ফাতেমার (সা.আ.) ঘরের দরজায় জোরে জোরে আঘাত করতে লাগলেন। শব্দ শুনে হযরত ফাতেমা (সা.আ.) ঘরের ভেতর থেকে বাইরে আসলেন। বাইরে এসেই তিনি মহানবী (দ.) দেখতে পেলেন। আর ভাবলেন, হয়তোবা মহানবী (দ.) তাঁকে দেখতে এসেছেন। তাই তিনি পূর্ব অভ্যাস অনুযায়ী মহানবীকে (দ.) অভ্যর্থনা জানালেন। মহানবী (দ.) ফাতেমার (সা.আ.) ভক্তিপূর্ণ এ অভ্যর্থনার প্রত্যুত্তরে বললেন,“তুমি কি জানো না, হুসাইনের কান্নায় আমি ব্যথিত হই?” (ফাযায়েলুল খামসাহ্, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২৫৬; তাবরানী প্রণীত আল-মু’জাম আল-কাবীর গ্রন্থে ইয়াযীদ বিন আবি যিয়াদের সূত্রে এ হাদীসটি বর্ণিত)

মহানবী (দ.) মিম্বর থেকে নেমে আসেন : একদিন মহানবী (দ.) মসজিদে নববীর মিম্বরে দাঁড়িয়ে জনগণের উদ্দেশ্যে উপদেশ ও বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। আর জনগণও একাগ্রতার সাথে তাঁর অমিয় বাণী শ্রবণ করছিল। হঠাৎ করেই মহানবীর (দ.) ভাষণ বন্ধ হয়ে গেল এবং তিনি ব্যথিত মনে মিম্বর থেকে নীচে নেমে আসলেন। তখন সবাই লক্ষ্য করল, শিশু হুসাইন (আ.) মসজিদে আসার সময় পায়ের সাথে কাপড় জড়িয়ে মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি যাচ্ছেন আর কান্নাকাটি করছেন। মহানবী তখন হুসাইনকে মাটি থেকে উঠিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং নিজের সাথে মিম্বরের ওপর নিয়ে আসলেন।

মহানবী (দ.) সিজদা দীর্ঘায়িত করেন : একদিন মসজিদে নববীতে জামাতে নামায আদায় করার সময় মহানবীর (দ.) পাশেই শিশু ইমাম হুসাইন (আ.) বসেছিলেন। কোনও এক রাকাতে মহানবী (দ.) সিজদা করার জন্য মাটিতে মাথা রাখলেন। আর তিনি এত বেশি সময় ধরে ঐ সিজদায় ছিলেন যে, মুসল্লীরা মনে করলেন সম্ভবত মহানবীর (দ.) কিছু হয়েছে অথবা তাঁর ওপর মহান আল্লাহর তরফ থেকে ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। নামায শেষে মহানবীকে (দ.) এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন,“না,আমার ওপর ওহী অবতীর্ণ হয়নি। তবে আমার দৌহিত্র (হুসাইন) আমার পিঠের ওপর চড়ে বসেছিল এবং আমি তাকে পিঠ থেকে নামাতে চাচ্ছিলাম না। কারণ আমার ইচ্ছা ছিল, সে নিজেই পিঠ থেকে নেমে আসুক।” (ইবনে হাজর আল-আসকালানী প্রণীত তাহযিব আত্-তাহযিব, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৪৬; ফাযায়েলে খামসাহ্, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১৯৩)

মহানবীর (দ.) কাঁধে হুসাইন (আ.) : মদীনাবাসীরা বহুবার দেখেছে, মহানবী (দ.) তাঁর দুই দৌহিত্রকে দু’কাঁধে বসিয়ে তাঁদের মন খুশী করার জন্য মদীনার অলিতে-গলিতে হাঁটছেন। অনেকে বহুবার চেষ্টা করেও তাঁদের একজনকেও মহানবীর কাঁধ থেকে নামাতে পারেনি। মহানবী কাউকে তা করার অনুমতি দেননি। কোন কোন সাহাবী এ দৃশ্য দেখে ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনকে বলতেন, “কতই না উত্তম বাহনের ওপর তোমরা দু’জন চড়েছো!” মহানবীও ঐ সাহাবীদের উদ্দেশে বলতেন, “আর এ দু’জনও কতই না উত্তম আরোহী!” আর এভাবে মহানবী তাঁর দুই দৌহিত্রের উচ্চমর্যাদা, সম্মান ও তাঁদের দু’জনের প্রতি তাঁর অগাধ ভালবাসা ও আত্মিক টানের কথা বর্ণনা করতেন।(মানাকিবে খাওয়ারিয্মী, পৃঃ ১১১।)

হুসাইন আমা হতে আমিও হুসাইন হতে : সহিহ মুসলিম ও তিরমিযী শরিফে এসেছে, ইয়ালী বিন মুররাহ্ বলেন, একবার মহানবী (দ.) আমাদেরকে দাওয়াত করলেন এবং আমরা ওই দাওয়াতে অংশ গ্রহণ করার জন্য রওয়ানা হলাম। চলার পথে আমরা একটি ময়দানে এসে উপস্থিত হলাম। সেখানে শিশুরা খেলাধুলা করছিল আর তাদের মধ্যে ইমাম হুসাইনও (আ.) ছিল। শিশুরা আমাদেরকে দেখা মাত্রই আমরা সেখান থেকে না যাওয়া পর্যন্ত খেলাধুলা বন্ধ করে দিল। মহানবী (দ.) আমাদের সামনাসামনি হাঁটছিলেন। তিনি যখন হুসাইনকে (আ.) ঐ শিশুদের মাঝে দেখতে পেলেন তখন তাকে দেখে চুমু না দিয়ে থাকতে পারলেন না। তাঁর সাথে লোকজন থাকা সত্ত্বেও সবাইকে দাঁড় করিয়ে রেখে হুসাইনের (আ.) দিকে গেলেন এবং তাকে বুকে জড়িয়ে ধরার জন্য হাত বাড়ালেন। কিন্তু হুসাইন এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে লাগল। আর এতে মহানবী (দ.) হাসলেন। অবশেষে তিনি হুসাইনকে (আ.) ধরে এক হাত তাঁর চিবুকে ও অন্য হাত তাঁর মাথায় রাখলেন। এরপর তিনি নিজের গাল হুসাইনের (রা.আ.) গালের সাথে মিশিয়ে বললেন,

حسین منی و انا من حسین، احبّ الله من احبّ حسینا. الحسین سبط من الاسباط

হুসাইন আমা হতে আমিও হুসাইন হতে। যে হুসাইনকে ভালোবাসবে আল্লাহ্ও তাকে ভালবাসবেন। হুসাইন সৎ কাজের ক্ষেত্রে যেন নিজেই একটি জাতি। (শেখ সুলায়মান আল-হানাফী আল-কুন্দুযী প্রণীত ইয়ানাবিউল মাওয়াদ্দাহ্, পৃঃ ২৬৪;আল-খাওয়ারিয্মী প্রণীত মাকতালুল হুসাইন, ১ম খণ্ড,পৃঃ ১৪৬; ইবনে আসীর প্রণীত আন্-নিহায়াহ্ ফী গারীবিল হাদীস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৩৪।)

মহানবী থেকে বর্ণিত সিব্ত্ (سبط) শব্দের একাধিক অর্থ করা যেতে পারে :

১। হুসাইন সৎ কাজের ক্ষেত্রে যেন নিজেই একটি জাতি অর্থাৎ একটি গোত্র বা জাতির সমান।(ইবনে আসীর প্রণীত আন্-নিহায়াহ্ ফী গারীবিল হাদীস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৩৪।)

২। সিব্ত্ শব্দের অপর অর্থ বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় পল্লবিত বৃক্ষ। আর হুসাইনকে সিব্ত্ বলার অর্থ হচ্ছে,মহানবীর বংশধররা হুসাইনের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করবে।

৩। এ হাদীসটির অর্থ এও হতে পারে,উচ্চ সম্মান ও মর্যাদার ক্ষেত্রে একটি জাতি যেমন সুউচ্চ আসনের অধিকারী এক্ষেত্রে হুসাইনেরও ঠিক এমনি আসন রয়েছে।

৪। এ হাদীসের অর্থ এমনও হতে পারে, একটি জাতি যেমন পুণ্য ও প্রতিদান পেয়ে থাকে ঠিক তেমনিভাবে ইমাম হুসাইনও মহান আল্লাহর কাছে পুণ্য ও প্রতিদান পাবেন।(পারতাভী আয-আযামাতে হুসাইন, পৃঃ ৩৩।)

মহানবী (দ.) হুসাইনকে (আ.) চুমু দিতেন এবং শরীরের ঘ্রাণ নিতেন : মহানবী (দ.) ইমাম হুসাইনকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন এবং স্নেহ করতেন। আর এ ভালোবাসা, স্নেহ ও মমতা প্রকাশ করার জন্য তিনি হুসাইনকে (আ.) চুমো দিতেন এবং এভাবে তিনি আত্মিক প্রশান্তি লাভ করতেন। মহানবী প্রায়ই হযরত ফাতেমাকে (আ.) বলতেন, আমার দৌহিত্রদ্বয়কে ডেকে আন, আমি তাদেরকে জড়িয়ে ধরে তাদের শরীরের ঘ্রাণ নেব।

কখনও কখনও হুসাইন (আ.) মহানবীর (দ.) কাছে আসতেন। তখন তিনি হযরত আলীকে (কা.) বলতেন, ‘হে আলী, ওকে ধরো এবং আমার কাছে নিয়ে এসো।’ হযরত আলী হুসাইনকে (আ.) ধরে মহানবীর কাছে নিয়ে আসতেন এবং মহানবী (দ.) তাঁকে ধরে চুমো খেতেন।

শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগেও মহানবী (দ.) ইমাম ভ্রাতৃদ্বয়কে (আ.) বুকে জড়িয়ে চুমো দিয়েছিলেন এবং তাঁদের শরীরের ঘ্রাণ নিয়েছিলেন। আর এ সময় তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল।(আল-খাওয়ারিয্মী প্রণীত মাকতালুল হুসাইন, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১০২)

মহানবীর (দ.) কোলে শিশু হুসাইন (আ.) : উসামা বিন যায়েদ থেকে বর্ণিত- এক রাতে মহানবীর (দ.) সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য বের হলাম। আমার খুব জরুরী কাজ ছিল তাঁর সাথে। মহানবীর (দ.) কাছে আমার প্রয়োজনের কথা বর্ণনা করলে তিনি আমার আবেদন গ্রহণ করলেন। কথা বলার সময় আমি দেখতে পেলাম, তাঁর দেহের দু’পাশ ফোলা যেন তাতে কিছু আছে। আমি ভাবছিলাম, কখন তিনি তাঁর চাদর খুলে ফেলেন। কিন্তু তিনি চাদর খুললেন না। তাই কথাবার্তা শেষ হলে আমি নিজেই তাঁকে প্রশ্ন করলাম, “হে রাসূলাল্লাহ, আপনার চাদরের নীচে কি লুকিয়ে রেখেছেন? তিনি স্মিত হেসে চাদরটি একটু সরালেন। অমনি আমি দেখতে পেলাম, হাসান ও হুসাইন নানার ঊরুর ওপরে নির্বিঘ্নে শুয়ে আছে যেন তারা শান্তির মাঝে ঘুমিয়ে পড়েছে। মহানবী এমতাবস্থায় বললেন-

هذان ابنای و ابنا ابنتی، اللهم انی احبهما فاحبّهما و احبّ من یحبهما

এরা দু’জন আমার দৌহিত্র এবং আমার কন্যার সন্তান। হে আল্লাহ্, আমি এ দু’জনকে ভালোবাসি। অতএব, তুমি তাদেরকে ভালোবেস যারা এ দু’জনকে ভালোবাসবে। (আল-খাওয়ারিয্মী প্রণীত মাকতালুল হুসাইন,১ম খণ্ড,পৃঃ ৯২।)

নেতা, নেতার সন্তান ও নেতাদের পিতা : হযরত সালমান ফারসি (রাযি.) বর্ণিত, একদিন হুসাইন (আ.) মহানবীর পবিত্র ঊরুর ওপর বসেছিলেন। তিনি তাঁকে চুমু দিচ্ছিলেন এবং তাঁকে বলছিলেন,

انت السیّد ابن السیّد ابو السادة- انت الامام ابن الامام ابو الائمة- انت الحجة ابن الحجة ابو الحجج تسعة من صلبک و تاسعهم قائمهم (حجّ)

তুমি ইমাম, ইমামপুত্র ও ইমামদের পিতা; তুমি মহান আল্লাহর নিদর্শন পুরুষ, নিদর্শন পুরুষের সন্তান এবং নয়জন নিদর্শন পুরুষের পিতা। আর এদের মধ্যে নবম নিদর্শন পুরুষই হচ্ছে ইমাম মাহ্দী। (মানাকিব, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২২৬; আল-খাওয়ারিয্মী প্রণীত মাকতালুল হুসাইন, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৪৬)

আবু আইয়ুব আনসারী (রাযি.) বলেন, একদিন মহানবীর কাছে গেলাম। হাসান ও হুসাইন (আ.) তাঁর বগলের নীচে ছিল এবং খেলা করছিল। মহানবীকে বললাম, আপনি এ দু’জনকে এত ভালবাসেন?” তিনি বললেন,কীভাবে এ দু’জনকে না ভালবেসে থাকতে পারি আর এরাই তো এ পৃথিবীর বুকে আমার সুগন্ধি ফুল! আর আমি এ দু’জনের সুঘ্রাণ নিয়ে থাকি। (উসদুল গাবাহ্, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৮)

হুসাইনের (আ.) তৃষ্ণায় মহানবী (দ.) বিচলিত হয়ে পড়েন : একদিন মহানবী (দ.) বাড়ি থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই শিশু হুসাইনের (আ.) কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। মহানবী হযরত ফাতেমার (সা.আ.) দিকে দ্রূত অগ্রসর হয়ে বললেন, ‘আমার দৌহিত্র কাঁদছে কেন?’ তখন হযরত ফাতেমা তাঁকে বললেন, ‘তৃষ্ণার্ত, তাই পানি চাচ্ছে।’ মহানবী (দ.) এ কথা শুনে পানির খোঁজে গেলেন। কিন্তু পানি পেলেন না। তাই তিনি নিজের পবিত্র জিহ্বা হুসাইনের (আ.) মুখের ভেতর রাখলেন এবং কান্না থামালেন। (আল্লামাহ্ ইবনে হাজার আসকালানী প্রণীত তাহযিব আত্-তাহযিব, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৯৮; আল-খাওয়ারিয্মী প্রণীত মাকতালুল হুসাইন, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৫২; ফাযায়েলুল খামসাহ্, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ১৭৯)

ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্য মহানবীর (দ.) কান্না : তারিখে ইবনে আসাকির মাকতালে খাওয়ারেযমী, মাজমাউয যাওয়ায়িদসহ আহলে সুন্নাতের অন্যান্য গ্রন্থে আবি সালমা ইবনে আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত হয়েছেঃ

হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন, আল্লাহর রাসূল (দ.) হুসাইনকে (আ.) তার উরুতে বসিয়েছিলেন। জিবরাঈল (আ.) তার কাছে এসে বললেন, “শীঘ্রই আপনার উম্মত (আপনার পরে) তাকে হত্যা করবে। মহানবীর (দ.) চোখ দু’টি অশ্রুসিক্ত হলো। জিবরাঈল বললেন, যদি আপনি চান তাহলে যে মাটিতে তিনি (ইমাম হুসাইন) শহীদ হবেন, তা আপনাকে দেখাতে পারি। তিনি বললেন, তাই করুন। জিবরাঈল (আ.) তাফ (কারবালা) থেকে মাটি এনে হযরতকে (দ.) দেখালেন ।

মুসতাদরাকে সহীহাইন, তাবাকাতে ইবনে সা’দ, তারিখে ইবনে আসাকিরসহ আহলে সুন্নাতের অন্যান্য গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে বর্ণনাকারী বলেনঃ উম্মে সালমা (সা.আ.) আমাকে বলেন যে, এক রাতে মহানবী (দ.) ঘুমানোর জন্য বিছানায় শুলেন এবং (কিছুক্ষণ) পরে বিষন্ন অবস্থায় ঘুম থেকে উঠলেন, পুনরায় ঘুমিয়ে গেলেন ও নীরব হলেন। দ্বিতীয়বার প্রথমবারের চেয়ে আরও বেশী বিষন্ন অবস্থায় ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। পুনরায় রক্তিম বর্ণের মাটি হাতে নিয়ে তাতে চুম্বনরত অবস্থায় জেগে উঠলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ মাটি কিসের? তিনি বললেন, জিবরাঈল আমাকে সংবাদ দিল যে, সে (হুসাইন) ইরাকের মাটিতে শহীদ হবে। আমি জিবরাঈলকে বললাম, যে মাটিতে শহীদ হবে তা আমাকে দেখাও। আর এ হলো সেখানকার মাটি।

ইমাম জয়নুল আবেদিন (রা.আ.) ইমাম হুসাইনের (রা.আ.) শাহাদতের স্মরণে ক্রন্দনের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে বলেছেন: যদি কোনও মুমিন ইমাম হুসাইনের (রা.আ.) শাহাদতের কথা স্মরণ করে ক্রন্দন করে, তাহলে এ ক্রন্দনের মধ্য দিয়ে তার চোখ থেকে যে অশ্রু ঝরবে, সেগুলোর প্রতিটি ফোটার জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে তার জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করবেন এবং সেখানে সে চিরন্তন অবস্থান করবে। (দ্র: সওয়াবুল আমাল, ১ম খণ্ড, পৃ. ১০৮ এবং মুনতাখাবুল মিযানুল হিকমাহ, পৃ. ২৮)

আউলিয়াদের শ্রদ্ধায় ইমাম হুসাইন (রা.আ.) : সুফি আউলিয়াদের কাছে পাক-পঞ্জাতন (নবী, ফাতিমা, আলী, হাসান, হুসাইন) অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। সকল সুফি আউলিয়া ইমাম হুসাইনের (আ.) উচ্চ মর্যাদা বর্ণনা করে গেছেন। যেমন দেখা যায়, হযরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি (রহ) গজলে-

“শাহ আস্ত হোসাইন, বাদশাহ্ আস্ত হোসাইন দ্বীন আস্ত হোসাইন, দিন পানাহ আস্ত হোসাইন সার দাদ নাদাদ দাস্তদার দাস্ত এ ইয়াযিদ হাক্কাকে বেনা এ লা ইলাহ আস্ত হোসাইন।”

(আধ্যাত্বিক সম্রাট হোসাইন, বাদশাহ হোসাইন, ধর্ম হোসাইন, ধর্মের আশ্রয়দাতা হোসাইন, মাথা দিলেন, তবু ইয়াযিদের হাতে হাত দিলেন না, সত্য তো এই যে লা-ইলাহার স্তম্ভই হোসাইন)

Related Post

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •