প্রচণ্ড শক্তি সঞ্চয় করে ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় ‘ফেনি’! বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহে দেশে গরম থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে স্বাভাবিকের চেয়ে গড়ে দুই থেকে তিন ডিগ্রি তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। স্থানভেদে কোথাও সাত ডিগ্রি পর্যন্ত বেশি গরম অনুভূত হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাড়তি উষ্ণতা, বাতাসে জলীয় বাষ্পের আধিক্য যুক্ত হয়েছে। এ ভয়াবহ গরম থেকে দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে ইতিমধ্যে সুস্পষ্ট লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে; যা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। ইতিমধ্যে ঝড়টির নাম দেয়া হয়েছে ‘ফেনি’।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও আবহাওয়া বিভাগের (বিএমডি) কর্মকর্তারা চানিয়েছেন, প্রচণ্ড শক্তি সঞ্চয় করে ‘ফেনি’ ৪-৫ মে বাংলাদেশে আঘাত হানতে পারে।
বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল-মে মাসে গরম একটু বেশিই থাকে। বিশেষ করে এপ্রিলে কম বৃষ্টি, বেশি গরম আর মে মাসে বৃষ্টি ও গরম দুটিই থাকে। কিন্তু এবার উল্টো। কয়েক দিন ধরে যে তাপমাত্রা লক্ষ্য করা গেছে, তা মোটেও স্বাভাবিক নয়।

এক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব একটা ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি এল নিনো মডোকির প্রভাবও আছে। তবে আশার খবর হল- বঙ্গোপসাগরে শ্রীলঙ্কার দিকে একটি সুস্পষ্ট লঘুচাপের রেখা দেখা যাচ্ছে। এটি পরিণতি পেলে হয়ত গরম কমবে। তবে আতঙ্কের দিক হল- এটি ১১৫-১২০ কিলোমিটার বেগে বাতাসসহ ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এর গতিপথ এত আগে নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়।
কিন্তু এন্টি ক্লকওয়াইজ (ঘড়ির বিপরীত দিক) পদ্ধতির হিসাবে এর গতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের আরাকান মনে হচ্ছে। যদিও ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (আইএমডি) বলছে, ভারতের দক্ষিণের তামিলনাড়ু থেকে মিয়ানমার পর্যন্ত বিস্তৃত উপকূলে কম-বেশি এর প্রভাব পড়বে। আগামী ৪-৫ মে নাগাদ এটি উপকূল অতিক্রম করতে পারে। তার আগে পর্যন্ত এ গরম অব্যাহত থাকতে পারে।
অধ্যাপক ইসলাম আরও বলেন, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ছাড়িয়েছে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিছুদিন ধরে প্রশান্ত মহাসাগরের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হচ্ছে।

সেখানকার গড় তাপমাত্রা ইতিমধ্যে দশমিক ৫ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। বর্তমানে এল নিনো মডোকি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এমনটি হলে সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম উপকূলে খরা বা কম বৃষ্টিপাত হয়। সেই হিসাবে বাংলাদেশে এবার মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হতে পারে।
সামনে তাপমাত্রা আরো বাড়বে…
১৭ এপ্রিলের পর দেশের কোথাও বৃষ্টি হয়নি। বঙ্গোপসাগরে বিরাজ করছে উচ্চচাপ বলয়। ফলে দখিনা বাতাসও নেই। বৃষ্টির পাশাপাশি দখিনা বাতাস না থাকায় তীব্র গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। বিগত বছরগুলোতে বৈশাখের এই সময়ে নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে তাপপ্রবাহ চললেও এবার সারা দেশেই গরমের উত্তাপ। এ বছরের মধ্যে গতকাল তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগে ২০১৬ সালে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি উঠেছিল। টানা দুই বছর পর ফের মৃদু তাপপ্রবাহে মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
জনজীবনে চলছে হাঁসফাঁস।

আবহাওয়া অফিস বলছে, এই মাসের শেষ অবধি চলবে রোদের এমন তেজ। এমনকি আজ তাপমাত্রা আরো বাড়ার আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস।
আবহাওয়া অফিসের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত বছর বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহ অর্থাৎ এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহে তাপমাত্রা ছিল গড়ে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ এ বছর সেটি গড়ে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। গত বছর এই সময়ে প্রচুর বৃষ্টিও হয়েছিল। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৭ সালেও ছিল একই চিত্র। এ সময়ে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল ওই বছর। কিন্তু এ বছর ১৭ এপ্রিলের পর থেকে দেশের কোথাও বৃষ্টি হয়নি। এ মাসের মধ্যে বৃষ্টির আর সম্ভাবনাও দেখছেন না আবহাওয়াবিদরা। ফলে জনজীবনে যে হাঁসফাঁস চলছে, তা আরো কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া অফিসের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এই মাসের শেষের দিকে সিলেটসহ বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি স্থানে বৃষ্টি হবে। তবে এটি হবে খুবই কম। নিম্নচাপের প্রভাবে ৩ মে থেকে দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে। তার আগ পর্যন্ত মৃদু তাপপ্রবাহ চলবে।

আবহাওয়া অফিস বলছে, এ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে গতকাল রাজশাহীতে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকাতে গতকাল তাপমাত্রা ছিল ৩৭.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া ফরিদপুর, ফেনী, যশোর, টাঙ্গাইলসহ আবহাওয়া অফিসের সব স্টেশনের তথ্য বলছে, ওই সব স্টেশনে তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁইছুঁই। আজ সেটি আরো বাড়তে পারে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মাসের শেষের দিকে বৃষ্টি না হলেও আগামী মাসের শুরুর দিকে হতে পারে। তার আগ পর্যন্ত মৃদু তাপপ্রবাহ থাকবে।
এদিকে তপ্ত রোদে অস্বস্তিতে পড়েছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষ। বৈশাখের এই গরমে ছাতা মাথায় নেমেছে অনেকে। কদর বেড়েছে জুস শরবতের। প্রচণ্ড গরমে শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। জরুরি কাজ ছাড়া অনেকে বাসা থেকে বের হচ্ছে না।

Related Post

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave A Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *