শেষের ‘ভূত’ তাড়িয়ে বাংলাদেশ জিতল ম্যাচ। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে এশিয়া কাপের মঞ্চে বাংলাদেশ হারাল এশিয়ার নতুন পরাশক্তি আফগানিস্তানকে। ৩ রানের জয়ে ১৪তম এশিয়া কাপের ফাইনালের আশা বাঁচিয়ে রাখল মাশরাফিরা।

বাংলাদেশের দেওয়া ২৫০ রান তাড়া করতে নেমে শেষ বল পর্যন্ত লড়ল আফগানিস্তান। শেষ ৬ বলে ৮ রান লাগত তাদের। মুস্তাফিজের করা প্রথম বলে ২ রান নেন রশিদ খান। পরের বলে রশিদ খান সাজঘরে। তৃতীয় বলে লেগ বাই থেকে আসে ১ রান। চতুর্থ বল ডট।
শেষ ২ বলে দরকার ৫ রান। ঠিক ওই মুহূর্তে নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল ম্যাচের কথাই ভাবছিল ক্রিকেটপ্রেমিরা। সেদিন সৌম্যর শেষ বলে ৫ রান লাগত। ছক্কা মেরে শিরোপার স্বপ্ন ভেঙে দেন দিনেশ কার্তিক। আজ মুস্তাফিজের ২ বলে আফগানিস্তানের লাগত ৫ রান । পঞ্চম বলে লেগ বাই-এ আরও ১ রান যোগ হয় আফগান স্কোরবোর্ডে। দুই দলের জয়-পরাজয়ের গড়ে দেবে ১ বলে ৪ রান।
ব্যাটসম্যান সামিউল্লাহ সেনওয়ারি সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু মুস্তাফিজের শর্ট বলে ব্যাট ছোঁয়াতে পারেননি সামিউল্লাহ। উইকেটের পিছনে মুশফিক বল মুঠোবন্দী করেই ‍উল্লাসে ফেটে পড়েন। উল্লাসে মেতে উঠে পুরো দল। নাটকীয় ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছে এশিয়া কাপে হট ফেবারিট বাংলাদেশও।

আবুধাবিতে ব্যাট-বলের লড়াই হয়েছে দারুণ। শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে কেউ কাউকে ছাড় দেয়নি। কিন্তু শেষ হাসিটা হেসেছে বাংলাদেশ। চড়া হাসি দিয়ে অঘোষিত ‘কোয়ার্টার ফাইনাল’ জিতেছে বাংলাদেশ। ‘সেমিফাইনালে’ পরশু বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। পাকিস্তানকে হারাতে পারলে ভারতের বিপক্ষে ফাইনাল খেলবে টিম বাংলাদেশ।

রোববার টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই চাপে বাংলাদেশ। এলোপাথারি শট খেলতে গিয়ে আফতাবের বলে আউট নাজমুল (৬)। ব্যাটিং অর্ডারে প্রমোশন পেলেও সুযোগটি কাজে লাগাতে ব্যর্থ মিথুন। মুজিবের বলে এলবিডব্লিউ হন মাত্র ১ রানে।

১৮ রানে ২ উইকেট হারানোর পর লিটনকে নিয়ে লড়াই শুরু করেন মুশফিক। শুরুর ধাক্কা সামলে দুজন স্কোরবোর্ড সচল রাখেন এবং দলকে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে নেন। কিন্তু আত্মঘাতী এক শটে সব ওলট-পালট। রশিদ খানের জুজু কাটিয়ে তাকে প্রথম ওভারেই ইনসাইড আউট শটে বাউন্ডারি মেরেছিলেন লিটন। তার ওই শটে মুগ্ধ হয়েছিল ধারাভাষ্যকাররাও। কিন্তু পরের বলে ‘পাগলাটে’ লিটন। স্লগ সুইপ খেলে নিজের উইকেট আত্মাহুতি দেন। উইকেট উপহার দেন রশিদকে। ভালো শুরু করা লিটন থামেন ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ ৪১ রানে।

এরপর দুটি দৃষ্টিকটু রান আউট। তাতে এলোমেলো বাংলাদেশের ব্যাটিং। প্রথমে মুশফিকের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট সাকিব। এরপর ইমরুল, মুশফিকের ভুল বোঝাবুঝিতে রান আউট মুশফিক। ৮১ থেকে ৮৭ পর্যন্ত যেতেই ৩ উইকেট নেই বাংলাদেশের। ২০.৫ ওভারে ৮৭ রানে বাংলাদেশের অর্ধেক ব্যাটসম্যান সাজঘরে।

পরের বীরত্ব গাঁথা গল্পটা শুধুই মাহমুদউল্লাহ ও ইমরুলের। খুলনা থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে দুবাই, এরপর দুবাই থেকে আবু ধাবি গিয়ে মাঠে নেমে পড়া কঠিন। কিন্তু দলের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ব্যাটিংয়ে নেমে ষোলোকলা পূর্ণ করেছেন ইমরুল। মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে রেকর্ড ১২৯ রানের জুটি গড়েন। ভেঙেছেন ১৯৯৯ সালে ঢাকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আল শাহরিয়ার ও খালেদ মাসুদের অবিচ্ছিন্ন ১২৩ রানের জুটি।
রেকর্ড রানের জুটির মূল কারিগর ছিলেন মাহমুদউল্লাহ। আগের ম্যাচে আম্পায়ারের ভুলে ইনিংস বড় করতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। আজ পারলেন। দুই আফগান রশিদ খান ও মুজিবকে খেলেছেন হেসেখেলে। পেসার আফতাব ও গুলবাদিন নাইবকে সামলেছেন দারুণভাবে। সব মিলিয়ে মাহমুদউল্লাহ ২২ গজের ক্রিজে নিজের রাজত্ব দেখিয়েছেন। ৫৯ বলে পেয়েছেন ক্যারিয়ারের ২০তম হাফ সেঞ্চুরি। হাফ সেঞ্চুরির পর নিজের খোলস থেকে বেরিয়ে রশিদকে দুটি ছক্কা মেরেছেন। আফতাবকে মেরেছেন চার। দ্রুত রান তুলতে গিয়ে ৪৭তম ওভারে সাজঘরে ফেরেন। আফতাবের বলে রশিদের হাতে ডিপ পয়েন্টে ক্যাচ দেন ৭৪ রানে। ৮১ বলে ৩ চার ২ ছক্কায় সাজান ইনিংসটি।
আর ইমরুল লড়েছেন শেষ বল পর্যন্ত। শেষ বলে বাউন্ডারি মেরে বাংলাদেশের রানকে ২৪৯ এ নিয়ে যান বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো ছয়ে ব্যাটিং করতে নেমে ৭২ রানে অপরাজিত থাকেন। ১৫তম হাফ সেঞ্চুরির ইনিংসটি সাজিয়েছেন ৮৯ বলে ৬ বাউন্ডারিতে। শেষে মাশরাফি ১০ ও মিরাজ ৫ রান করে দলের স্কোরবোর্ড সমৃদ্ধ করেন।
বল হাতে আফগানিস্তানের হয়ে ৩ উইকেট নেন পেসার আফতাব। রশিদ খান ৪৬ রানে ১টি এবং মুজিব ৩৫ রানে ১ উইকেট নেন।
লক্ষ্য তাড়া পছন্দ নয় আফগানিস্তানের। শেষ পাঁচ লক্ষ্য তাড়ায় চারটিতেই হেরেছে তারা। মাশরাফির টস জয় শুরুতেই পিছিয়ে দেয় আফগানিস্তানকে। তবুও এবার চেষ্টা করেছে দলটি। শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে।
মোহাম্মদ শাহজাদ শুরুতে মিথুনের হাতে জীবন পেলেও দ্রুত রান তোলেন। ডানহাতি ওপেনার করেন ৫৩ রান। মাহমুদউল্লাহর জাদুকরী বোলিংয়ে বোল্ড হন শাহজাদ। এর আগে আফগান ইনিংসে শুরুর ধাক্কাটি দেন শেষটা রাঙানো মুস্তাফিজ। তার প্রথম স্পেলের প্রথম বলে পয়েন্টে ক্যাচ দেন ৮ রান করা এহসানউল্লাহ। অষ্টম ওভারে উড়ন্ত সাকিবের দূর্দান্ত থ্রোতে রান আউট হন রহমত শাহ (১)।
তৃতীয় উইকেট থেকে প্রতিরোধ গড়ে তুলে আফগানিস্তান। ছোট ছোটো জুটিতে বাংলাদেশকে চাপে রাখে তারা। যখনই তাদের জুটি বড় হয়েছে তখনই বাংলাদেশ পেয়েছে উইকেট। মাহমুদউল্লাহ, শাহজাদ ও হাসমতউল্লাহর ৬৩ রানের জুটি ভাঙেন। এরপর চতুর্থ উইকেটে আসগর আফগান ও হাসমতউল্লাহ ৭৮ রান যোগ করেন।

নিজের তৃতীয় স্পেলে বোলিংয়ে এসে এই দুই ব্যাটসম্যানকে পরপর দুই ওভারে সাজঘরে ফেরত পাঠান মাশরাফি। আসগর আফগান ৩৯ ও হাসমতউল্লাহ সর্বোচ্চ ৭১ রান করেন। এরপর মোহাম্মদ নবীর ৩৮ রানে জয়ের খুব কাছাকাছি চলে যায় আফগানিস্তান। কিন্তু ৪৯তম ওভারে নবীকে সাজঘরে পাঠিয়ে বাংলাদেশের জয়ের আশা জাগিয়ে তুলেন সাকিব।

এরপর শেষ ওভারে পার্থক্য গড়ে দেন মুস্তাফিজ। উত্তেজনার ম্যাচে আফগানিস্তানকে হারিয়ে এশিয়া কাপে মধুর প্রতিশোধও নিল বাংলাদেশ। গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশকে হারিয়েছিল তারা। এর আগে ২০১৪ এশিয়া কাপেও বাংলাদেশকে ঘরের মাঠে হারায় তারা। এবার আবু ধাবিতে প্রতিশোধ নিল মাশরাফির দল।

পাশাপাশি দারুণ জয়ে স্নায়ু চাপও জয় করল বাংলাদেশ। শেষের দিকে একাধিক ম্যাচ হারের তিক্ত স্বাদ পেয়েছে বাংলাদেশ। মুলতান, মিরপুর, বেঙ্গালুরু, কলম্বোতে জড়িয়ে আছে স্বপ্নভঙ্গের স্মৃতি। এবার বিজয়ের গল্প রচিত হলো আবু ধাবিতে। আর এ জয়ের নায়ক মাহমুদউল্লাহ। ব্যাট-বল হাতে সমানতালে পারফর্ম করায় ম্যাচসেরার পুরস্কারটা উঠেছে তার হাতে।
আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর সুপার ফোরের ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে লড়বে টাইগাররা। খেলাটি শেখ জয়েদ স্টেডিয়াম, আবুধাবি তে বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে শুরু হবে। ফাইনালে জায়গা করে নিতে এই ম্যাচটা যে জেতাই লাগবে বাংলাদেশকে।
বাংলাদেশ দল : মাশরাফি বিন মর্তুজা (অধিনায়ক), সাকিব আল হাসান (সহ-অধিনায়ক), মোহাম্মদ মিঠুন, লিটন কুমার দাস, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদউল্লাহ,মেহেদি হাসান মিরাজ, নাজমুল ইসলাম অপু, রুবেল,মোস্তাফিজুর রহমান, ইমরুল কায়েস, সৌম্য সরকার।

Related Post