রোগ মুক্তি ও মনোবাসনা পুরণের আশায় পুরনো বিলের দিকে লাইন দিয়ে ছুটছে মানুষ। বিলের স্বল্প জলে ডুব দেবার প্রাণান্ত চেষ্টায় গড়াগড়ি খাচ্ছে নানা বয়সী মানুষ, কাঁদা পানিতে শরীর চোবাচ্ছে, পবিত্র জ্ঞানে নোংড়া পানি সংগ্রহ করছে, নিয়ত করে কাঁদাপানি শরীরে ছিটিয়ে দিচ্ছে, ঘোলাজল পান করছে, নিয়ে যাচ্ছে বোতলে ভরে, জগে করে। চলছে হুড়োহুড়ি। এ যেন গল্প সিনেমার কাহিনী কিন্তু সত্য হচ্ছে, কোন গল্প বা সিনেমা নয় এটা, বাস্তব ঘটনা এবং তা ঘটছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে।
বিলের পানিতে সব আশা পূর্ণ হয়ে যায় এমন গুজবে কান দিয়ে ময়মনসিংহের ত্রিশালে রামপুর ইউনিয়নের চেচুয়া বিলে প্রতিদিন ভিড় জমাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা, শারীরিক প্রতিবন্ধী, পাগল, পক্ষাতগ্রস্ত বিভিন্ন রোগীসহ নানা ধরনের নারী পুরুষের পদচারণায় সরগরম পুরো এলাকা। ক্ষতি হচ্ছে হেক্টর হেক্টর জমি ফসল। সামাল দিতে প্রশাসন হিমশিম খাচ্ছে। গুজব প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসন থেকে তেমন কোন পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত মঙ্গলবার ত্রিশালের চেচুয়া বিলের মাঝখানে একশ মিটার জায়গাজুড়ে থাকা কচুরিপানা হঠাৎ না থাকাকে কেন্দ্র করে এলাকার এক শ্রেণির অসাধু চক্র প্রচার শুরু করে গায়েবি অলৌকিক কোন শক্তি এখানে এসে কচুরী পানা সড়িয়ে দিয়েছে। এখানকার পানি পান করলে মনোভাসনা পূর্ণ হবে এবং সকল রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশ থেকে সকাল সন্ধ্যা মধ্যরাত অবধি হাজার হাজার মানুষ তাদের রোগী, সন্তান, পায়ে সিকল বাধা পাগল, যৌবন ফিরে পাবার আশায় বৃদ্ধ মানুষ কাদাপানিতে ডুব দিয়ে সেই পানি পান করছে আর বোতলে করে পানি নিয়ে যাচ্ছে।
রবিবার (৭ অক্টোবর) সকালে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিলের আশপাশে প্রায় চার কিলোমিটার জায়গা জুড়ে মানুষের লম্বা লাইন। ছুটছে সবাই বিলের পানে। আর কাঁদা মাটিতে নারী পুরুষ অসুস্থ রোগী গড়াগড়ি খাচ্ছে। কাউকে কাউকে স্বজনরা ধরে এনে পানিতে ডুবাচ্ছে।
এতে করে রোগমুক্তি কিংবা মনোবাসনা পূর্ণ হবার বদলে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন অনেকে। কেউবা পানিতে ডুব দিয়ে আফসোস করছেন।
নেত্রকোনার কলমাকান্দার আবুল হোসেন এসছেন তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে ভাল করার জন্য। তিনি শুনেছেন এখানে গেলে সকল রোগী ভাল হয়ে যায়। তাই ডুবানোর জন্য নিয়ে এসেছে।

ভালুকার সিডস্টোরের নাজমা বেগম বলেন, শুনেছি এখানে অনেক রোগী ভাল হয়েছে। তাই আমি আমার ছেলেকে নিয়ে এসছিলাম জন্ম থেকেই সে প্রতিবন্ধী। এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে এই পানিতে ডুব দিলে সুস্থ থেকে অসুস্থ হবার আশঙ্কাই বেশী।
তারাকান্দা উপজেলা থেকে আসা অশিতিপর বয়সী সুফিয়া খাতুন বলেন, ‘আমার ছেলে সৌদি আরব থেকে জানিয়েছে এইখানে ডুব দিলে আর পানি পান করলে আমার মেয়ের বিয়ে হয়ে যাবে। তাই মেয়েকে নিয়ে এসেছি। আমার মেয়ের বয়স অনেক হলেও বিয়ে হচ্ছে না বিয়ে ভেঙ্গে যায়।’
ফুলবাড়িয়ার আছিম থেকে আসা রুহুল আমিন তার মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে শিকলে বাঁধা অবস্থায় নিয়ে এসেছেন পানিতে ডুবিয়ে সুস্থ করার জন্য। তাকে ফোন করে এক আত্মীয় জানিয়েছে এখানে আসলেই তার ছেলে ভাল হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ডুব দেয়ার পর দেখা যায় শিকল পরিহিত অবস্থায় ঐ রোগিটি খিচুনি শুরু হয়ে গেছে। পরে তাকে দ্রুত মেডিকেলে নেওয়া হয়।
স্থানীয় একাধিক এলাকাবাসী জানায়, সরকারী খাস জমির এই বিলটা দখলে নেয়ার জন্য একটি অসাধু চক্র গুজব ছড়িয়ে এখানে মাজার করতে চাচ্ছে। এমনকি তারা সংঘবদ্ধ হয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীকেও ধোঁকা দিচ্ছে। মানুষকে ফোনে ফেসবুকে স্বশরীরে বলছে গতকাল অমুক ভাল হয়েছে, তার পা ভাল হয়ে গেছে, দৃষ্টি প্রতিবন্ধি চোখে দেখতে পাচ্ছে এসব গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে।
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নাজমুল হক বলেন, আমরা গুজব না ছড়ানোর জন্য মাইকিং করেছি, মানুষকে সচেতন করছি, কিন্তু এতে কোন কাজ হচ্ছে না। এখন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোক আসতেছে। যার ফলে বিলের আশেপাশের ধানের ফসলের জমি নষ্ট হচ্ছে। হাজার হাজার মানুষ ফসলি জমি নষ্ট করে বিলে ডুব দিতে যাচ্ছে।
ত্রিশাল থানা ওসি (তদন্ত) ফায়জুর রহমান জানান, হাজার হাজার মানুষ গুজবে কান দিয়ে বিলের পঁচা পানিতে ডুব দিচ্ছে। গতকাল থেকে দুদিনে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষের আনাগোনায় বিলের সব ফসলি জমি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মানুষ ঢল সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মানুষকে গুজবের ব্যাপারে সচেতন করতে কাজ করে যাচ্ছি।
এক সপ্তাহ যাবৎ এ ধরনের গুজবে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হলেও উপজেলা প্রশাসন থেকে সচেতনতার জন্য তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহন না করায় এলাকাবাসীর মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এরশাদ উদ্দিন ঘটনাস্থলে গেলেও তেমন কোন পদক্ষেপ নেননি।
সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে জনপ্রতিনিধি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দিয়ে এলাকায় কোন মাইকিং বা সমাবেশ লক্ষ্য করা যায়নি। এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে গেলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ইউএনও পরে বক্তব্য দিবেন বলে জানান।

Related Post