অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক কিংবা বাসস্ট্যান্ড—ইদানীং রাজধানীর যেকোনো প্রান্তেই চোখে পড়ে একজন লোক টেবিলের ওপরে কিছু বাতি সাজিয়ে বসে আছেন। আর সাউন্ডবক্সে অনবরত বেজেই চলেছে, ‘শুধুমাত্র কোম্পানির প্রচারের জন্য ৩০০ টাকার একটি বিদ্যুৎসাশ্রয়ী বাতি (এনার্জি সেভিং লাইট) পাচ্ছেন মাত্র ১০০ টাকায়।’ রাজধানীতে বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে কোম্পানির প্রচারের নামে কম মূল্যে বাতি বিক্রি। এসব অস্থায়ী দোকানদার যে বাতিগুলো বিক্রি করেন, সেগুলো কমপ্যাক্ট ফ্লুরোসেন্ট ল্যাম্প (সিএফএল), জ্বালানিসাশ্রয়ী বলে বাতিগুলো ‘এনার্জি সেভিং লাইট’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। স্বল্প পুঁজি ও ছোট পরিসরে ব্যবসা করা যায় বলে অনেকেই নেমেছেন এই বাতি বিক্রির ব্যবসায়। বেচাবিক্রিও মন্দ না। তবে এসব বাতি কতটা স্বাস্থ্যসম্মত, বিদ্যুৎসাশ্রয়ী এবং দীর্ঘস্থায়ী কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। মিরপুর ১ নম্বর গোলচত্বরের পদচারী-সেতুতে ওঠার তিনটি সিঁড়ির আশপাশে তিনজন ১০০ টাকায় বাতি বিক্রি করেন। তিনজনের পাশেই সাউন্ডবক্সে বাজছে, ‘৩০ ওয়াটের একটি এনার্জি লাইট ৭০% ডিসকাউন্টে পাচ্ছেন মাত্র ১০০ টাকা। একটি এনার্জি লাইট দোকানে কিনতে গেলে লাগবে ৩০০ টাকা। ছয় মাসের গ্যারান্টিসহ পাচ্ছেন মাত্র ১০০ টাকা। শুধু কোম্পানির প্রচারের লক্ষ্যে এ সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য।’

জহিরুল ইসলাম চার মাস ধরে বাতি বিক্রি করছেন। শাহ এনার্জি কোম্পানির ডিলার তিনি। পরিবার নিয়ে মিরপুর ১০ নম্বরে থাকেন। আগে অন্য কাজ করলেও এখন বাতি বিক্রি করে বেশ ভালোই চলছেন তিনি। জহিরুল বলেন, ‘বাতিগুলোর মান খারাপ না। আলোও উজ্জ্বল। ছয় মাসের মধ্যে নষ্ট হলে কোম্পানি পরিবর্তন করে দেয়। কোনো দিন ৩০টা, কোনো দিন ২০টা বিক্রি হয়।’ রাস্তায় স্বল্পমূল্যে বিক্রি হওয়া বাতিগুলো মূলত চীনে তৈরি। শাহ কোম্পানি, রানা ইলেকট্রিক, ন্যাশনাল কোম্পানি, স্টার লাইট ইত্যাদি নানা নামে বিক্রি হয়। নবাবপুর ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এসব বাতি পাইকারি বিক্রি হয়। খুচরা বিক্রি করে প্রতিটি বাতিতে ৩০-৩৫ টাকা লাভ থাকে বলে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়।
রাস্তায় বিক্রি হওয়া এসব স্বল্পমূল্যের বাতির ক্রেতা মূলত নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত লোকজন। মিরপুরে বাতি কিনতে আসা মো. মাহবুব বলেন, ‘তিন-চার শ টাকা দিয়ে বাতি কেনার সামর্থ্য নাই। এই বাতিগুলায় হলুদ বাতির চাইতে অনেক ভালো আলো হয় আর দাম কম। তাই এগুলা কিনি।’ মান নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) বাধ্যতামূলক পণ্যের তালিকায় না থাকায় এসব বাতির মান পরীক্ষা করে না বিএসটিআই। তবে বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এসব বাতির বিষয়ে একটি আইন প্রণয়নের কাজ করছে। মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে আইন হলে বিএসটিআই এসব বাতির মান নিয়মিত পরীক্ষা করবে।

বুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান খান প্রথম আলোকে বলেন, নিম্নমানের সিএফএল বাতির আবরণ ভালো থাকে না। এসব বাতি থেকে অতিবেগুনি রশ্মি নির্গত হয়। ফলে কাছ থেকে ব্যবহার করলে এসব বাতি ক্ষতিকর। বাতির ভেতরে পারদসহ কিছু ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। বাতি ভেঙে গেলে এসব পদার্থ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। প্রথম আলো থেকে নেওয়া অন্য দিকে কালের কণ্ঠতে আসলো
রাজধানীর মিরপুর ১০ নম্বরের ফায়ার সার্ভিসের সামনের ফুটপাতে এনার্জি সেভিং লাইটস বিক্রি হচ্ছে। সাথে একটা সাউন্ড বক্সে রেকর্ড করা হয়েছে কিছু। সেই সাউন্ড বক্সে অনবরত বলে যাচ্ছে, ‘শুধু কম্পানির প্রচারের জন্য ৩০০ টাকার এনার্জি বালবগুলি পাচ্ছেন মাত্র ১০০ টাকায়’। একই কথা বারবার বলে যাচ্ছে রেকর্ডিং প্লেয়ার। কালের কণ্ঠে এমন একটি সংবাদ প্রকাশের পর প্রচুর ব্যবহারকারী এই এনার্জি লাইটগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি মন্ত্রণালয় এসব বাতির বিষয়ে একটি আইন প্রণয়নের কাজ করছে। মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে আইন হলে বিএসটিআই এসব বাতির মান নিয়মিত পরীক্ষা করবে। ভাই এত কম দামে দিচ্ছেন কেন লাইটগুলো? মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বরের একজন বিক্রেতার নিকট এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এটা কম্পানির প্রচারের জন্য। লস করে আপনাদের কম্পানির প্রচার কতদিন করবেন? বিক্রেতা হাসলেন। কথা বলেন না। আচ্ছা বলেন, আপনাদের প্রচার কবে শেষ হবে, আমি তো আপনাকে দুই বছর ধরে লস করে বাতিগুলো বিক্রি করতে দেখছি? বিক্রেতা এবার একটু মুখ প্রসারিত করেই হাসলেন। বললেন ভাই আমাদের প্রচার তো শেষ হবে না।এই বাতি সম্পর্কে খবর প্রকাশ করার পর শরীফ নামের একজন মন্তব্য করেছেন, এই লাইটগুলো নষ্ট সার্কিট থেকে রিপেয়ার করে বিক্রি করা হয়। গুলিস্তান, নবাবপুর, কাপ্তান বাজার, পাটুয়াটুলীতে এই লাইটগুলো ৪৫ টাকা থেকে পাইকারি মুল্যে বিক্রি হয়। ৩২ ওয়াট লাইটে ১০ ওয়াট ও আলো নাই।

অর্ধবৃত্ত নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘৩০০ টাকার বাত্তি ১০০ টাকায়, আর আলো দেয় ৫০ টাকার। পুরাই ধোঁকাবাজি। আমি নিজে ধরা খাইছি। ১০০টাকার ৩টা ৩৩ ওয়াটের বাত্তি লাগাইয়া রুমে অন্ধকার মনে হয়। অথচ ফিলিপসের ২৪ ওয়াট একটাই ঝাক্কাস আলো দিতাছে। কথায় আছে, জিনিস যেটা ভালো, দাম তার একটু বেশিই।’ জিসান নামের এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘এই লাইট এর আলো অন্য যে কোনো এনার্জি বাল্ব এর চেয়ে অনেক কম। আমি কিনে দেখেছি। তাই এত কম দামে দেওয়া যায়।’জানা গেছে, এসব বাতি নবাবপুর ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় পাইকারি বিক্রি হয়। খুচরা বিক্রি করে প্রতিটি বাতিতে ৩০-৩৫ টাকা লাভ থাকে বলে বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। বুয়েটের তড়িৎকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান খান বলেন, নিম্নমানের সিএফএল বাতির আবরণ ভালো থাকে না। এসব বাতি থেকে অতিবেগুনি রশ্মি নির্গত হয়। এই বাতিগুলো কাছ থেকে ব্যবহার করলে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। বাতির ভেতরে পারদসহ কিছু ক্ষতিকর পদার্থ থাকে। বাতি ভেঙে গেলে এসব পদার্থ মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।

Related Post

Spread the love
  • 7.5K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7.5K
    Shares