যেকোন জায়গায় বেড়াতে গেলে প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায় তা হলো, সেখানে থাকার মত হোটেল আছে তো? সে হোটেলের খরচ বাজেটে কুলোবে তো? স্বাভাবিকভাবেই অধিকাংশ মানুষই থাকার জন্য সবচেয়ে সস্তা হোটেলেরই খোঁজ করে। তাই মনে হতেই পারে, বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা হোটেল কোনটি? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য খুব দূরে কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। কারণ পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে সস্তা আবাসিক হোটেল বলে ধারণা করা হয় যেটিকে, সেটির অবস্থান বাংলাদেশেই এবং তাও আবার এই ঢাকা শহরের পাশ দিয়ে বয়ে চলে বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে।

যেখানে মাত্র ৪০ টাকা দিয়েই রাত্রিযাপন করা যায়। গত বছর অক্টোবর মাসে কয়েকটি বৈশ্বিক গণমাধ্যমে এই হোটেলের সংবাদ প্রকাশিত হয়, এবং তারপর থেকেই এটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। অনেক খোঁজাখুঁজি শুরু হয় যে বিশ্বের আর কোথাও এর চাইতে সস্তায় রাত কাটানোর মত হোটেল আছে কিনা। তবে এখন পর্যন্ত সেরকম কোন হোটেলের হদিস যেহেতু মেলেনি, তাই আমরা ধরে নিতেই পারি যে সদরঘারে বুড়িগঙ্গায় ভাসমান এই হোটেলগুলোই পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা হোটেল।
হোটেলগুলো ভাসমান জাহাজের উপর গড়ে তোলা হয়েছে। মাত্র ৪০ টাকা ভাড়া হলেও, তার বিনিময়ে এ হোটেলে যেসব সুবিধা মেলে, তাকে আশাতীতই বলা চলে। ঘরগুলো খুব ছোট, একটি কম্যুনাল ব্যাংকের চেয়ে আকারে খুব বেশি বড় হবে না; তবে সার্বক্ষণিক পানি এবং টয়লেটের ব্যবস্থা ঠিকই আছে। খাবার আলাদা করে কিনে খেতে হয়।
হোটেলগুলো পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। তবে শুধু পর্যটকরাই যে এ হোটেলে রাত কাটায় তা নয়। স্থানীয় অনেক মানুষ যাদের স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা নেই কিংবা দিন মজুর- তারাও মাঝেসাঝেই এই হোটেলে চলে আসে কয়েকটা রাত খুব কম খরচে কাটিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। প্রতিটি অতিথিকে একটি করে লকারের মত দেয়া হয় যাতে তারা তাদের জিনিসপত্র সেখানে নিরাপদে গচ্ছিত রাখতে পারে। একসাথে প্রায় চল্লিশ জনের মত অতিথি প্রতি রাতে ৪০ টাকার বিনিময়ে থাকতে পারে এই হোটেলে, এবং এমন অনেকেও আছে যারা একটানা তিন মাসের বেশিও এই হোটেলে থেকে যায়।
হোটেলগুলোতে কেবিনরুমও রয়েছে। যেখানে আরেকটু বেশি ‘প্রাইভেসি’ পাওয়া যায়। সেই রুমগুলোকে ডাকা হয় ‘কেবিন’ নামে, আর সেখানে রাত কাটানোর জন্য গুনতে হয় ৯০ টাকা করে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, হাউস বোট থেকেই নৌকায় ভাসমান হোটেলের চিন্তা-ভাবনা আসে। অতীতে ভাগ্যকুলের কুণ্ডু জমিদার ও ঢাকার নবাবদের একাধিক রাজকীয় প্রমোদতরি বুড়িগঙ্গায় ভাসমান অবস্থায় থাকত। এসব প্রমোদতরি বিভিন্ন রাজকীয় অতিথি কিংবা রাষ্ট্রীয় সফরে ব্যবহৃত হতো। এর মধ্যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯৮ সালে ঢাকায় এসে কুণ্ডুদের প্রমোদতরি এবং ১৯২৬ সালে নবাবদের হাউস বোট ব্যবহার করেছিলেন। তা ছাড়া ব্রিটিশদের প্রমোদতরি মেরি এন্ডারসন পরে পাগলা ঘাটে ভাসমান রেস্তোরাঁ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। কয়েক বছর আগে আগুনে ওই ঐতিহাসিক প্রমোদতরিটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

উল্লেখ্য, ১৬০৮ সালে (মতান্তরে ১৬১০) সম্রাট জাহাঙ্গীর ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা করে তার সুবেদার ইসলাম খাঁ চিশতীকে সেখানে পাঠান। চাঁদনী নামের একটি প্রমোদতরিতে করে তিনি দলবলসহ বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নামেন। সেই স্থানটি পরে ইসলামপুর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। আর যেখানে চাঁদনী প্রমোদতরি রাখা হতো সেটার নামকরণ হয় চাঁদনীঘাট। এখনো চাঁদনীঘাট রয়ে গেছে, কিন্তু সেখানে কোনো প্রমোদতরি নোঙর করে না।

ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন
https://www.facebook.com/PublicbdOfficial/videos/2145737755676319/

Related Post