২৭ জুলাই, ১৯৯৪। প্রিয় মাঠের পাশে লাল নিশান পিকাপ ট্রাকটি থামালেন শেষবারের মতো। এখানেই কেভিন একদিন খেলা করতেন, পড়াশোনা করতেন, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতেন। কেভিন গাড়ি চালু রেখে গাড়ির এক্সিট পাইপের সঙ্গে একটি নল লাগিয়ে, তার অপর প্রান্ত চেপে ধরেন নিজের নাকে | সেই নল দিয়ে বেরিয়ে আসা কার্বন মনোক্সাইড বিষ আহরণে মনোযোগ দিলেন। এরপর আস্তে আস্তে নিভিয়ে দিলেন নিজেকে। মিশে গেলেন সন্ধ্যার আকাশের তারকাদের মাঝে।
কেভিন কার্টার ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৬০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে জন্ম গ্রহণ করেন। খেলাধুলার ফটো সাংবাদিকতার মধ্যদিয়ে কর্ম জীবন শুরু। ১৯৯৩ সালের মার্চে সুদানে দুর্ভিক্ষের ছবি তোলার জন্য অ্যাসাইনমেন্ট পান। তখন সুদানে দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা প্রতিদিনই বাড়ছে। খাদ্যের অভাবে দিনের পর দিন মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রান্তরের পর প্রান্তর, সমতল; কোথাও কোনো ফসলের ছিটে ফোঁটা নেই। শুধু তীব্র তাপদাহ, পথে প্রান্তরে কোথায়ও পানি নেই। সুদানের আয়দ গ্রাম। কেভিন এখানে এসে থামলেন। এখানে উত্তাপ যেন কংকালসার মানুষের দেহকে পুড়িয়ে দেওয়ার আনন্দে মেতেছে। প্রত্যেকটি মানুষই ত্রাণের খাদ্যের উপর নির্ভরশীল। কেভিনও সেইদিন সেই দুর্ভিক্ষে অসহায় মানুষগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
ক্যামেরার লেন্স ঘোরাতে ঘোরাতে হঠাৎ আবিষ্কার করলেন এক কংকালসার ক্ষুধার্ত শিশুকে, যে খাদ্যের অন্বেষণে বেরিয়েছে। তবে এক চুল পরিমানও নড়বার সাধ্য তার অবশিষ্ট নেই। যেন মুখ থুবড়ে উপুড় হয়ে বসে আছে খা-খা রোদ্দুরের মাঝে। আর শিশুটির পেছনে ঠিক কাছাকাছি শকুনও ওৎ পেতে আছে শিকারের অপেক্ষায়। কেভিনের ক্যামেরার লেন্স দারুনভাবে সতেজ হয়ে ওঠে; প্রায় ২০ মিনিট অপেক্ষা করে কেভিন কয়েকটি শট নিয়ে স্থান ত্যাগ করেন। অদূরে একটি গাছের নিচে বসে ধুমপান করতে করতে পরবর্তী কাজের জন্য তৈরি হতে থাকেন। কেভিন শুধু ভেবেছিল স্থিরচিত্র ধারণ করাই তার কাজ।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস সেই ছবি প্রথম ছেপেছিল ২৬শে মার্চ ১৯৯৩ সালে। তারপর থেকে হৈ চৈ পড়ে যায়; রীতিমত সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো নেমে পড়ে ছবির নেপথ্যে। এরপর এপ্রিল ১৯৯৩। কেভিন কার্টার এই ছবির বদলে উঠে এলেন খ্যাতির চুঁড়ায়। পুলিৎজার পুরস্কার জিতে নিল তার এই কালজয়ী ছবি।
আর এই জয়ই কাল হয়ে দাঁড়ায় কেভিনের কাছে। বিবেকের নিয়ত দংশনে তাকে মনে হয় কুড়ে কুড়ে শেষ করে দেয়। এদিকে তাকে দাঁড়াতে হল সারাবিশ্বের মুখোমুখি। কি হলো সেই ক্ষুধার্ত শিশুটির? কিভাবে আপনি ফেলে আসতে পারলেন সে শিশুটিকে? এভাবে নানা প্রশ্নের জবাব তার কাছে বোবা পাথরের মত জমাট বাঁধতে শুরু করল। এ কারণে ছবিটি তোলার মাত্র তিন মাসের পরই চিরতরে নিজেকে নিস্তব্ধ করে দিলেন কেভিন।

ছোট্ট একটি চিরকুটে লিখে গেলেন তাঁর আত্মহত্যার কারণের কিয়দংশ- ‘আমি সত্যিই, একদম সত্যিই দুঃখিত। দুঃখগুলো আমার আনন্দকে অতিক্রম করে কবেই উবে গেছে। আনন্দের কোনো চিহ্ন আর অবশিষ্ট নেই। সত্যিই আমি চরম হতাশ।’ অথচ একটি মাত্র ছবি তুলেই নাড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বের বিবেক। বিপরীতে প্রতিনিয়তই হারাচ্ছিলেন নিজের বোধ-বুদ্ধি ও বিবেক। পুলিৎজার পুরস্কার পাওয়ার পর নিজেকে আর ধরে রাখতে পারছিলেন না। মাত্র তিন মাসের মাথায় আত্মহত্যার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে নিলেন তিনি।
কেভিন কার্টার আত্মহত্যার কারণ হিসাবে তার সাথে থাকা বিখ্যাত চিত্রসাংবাদিক জোআঁও সিলভা জানিয়েছেন, ‘কার্টার ছবি তুলে আসার আগে সেই শকুনটাকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দিয়ে আসেন। তবে ভয়ে তিনি বাচ্চাটিকে ধরেননি। কারণ তিনি এই ভেবে ছিলেন শিশুটি কোনো ভয়ানক রোগে আক্রান্ত হয়েছে | তবে ছবি না তুলে যদি বাচ্চাটিকে নিকটবর্তী ত্রাণশিবিরে নিয়ে গেলে শিশুটি হয়তো বেঁচে যেত এই হতাশায় ও অনুশোচনায় আত্মহত্যা করেন কেভিন! অথচ শিশুটি সেই সময় মারা যায়নি, আরো ১৩ বছর বেঁচে ছিল। নিয়ং কং নামের ছবির বাচ্চাটি মারা যায় ২০০৭ সালে।
অনুশোচনায় ফটো সাংবাদিকের আত্মহত্যা অথচ শিশুটি বেঁচেছিল আরো ১৩ বছর!

Related Post