ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক রিজাল গিলাং সানুসি পুত্র। বয়স তার ২৬ বছর। সমবয়সী স্ত্রীর নাম উইতা সিরিয়ানি। এই হাসি-খুশি দম্পতির ছিল সুন্দর এক সংসার। আলো হয়ে ছিল পনের মাস বয়সী কন্যা সন্তান কিয়ারা। কিন্তু নিয়তি যে নির্মম এক পরিণতি লিখে রেখেছে এই দম্পতির জন্য, তা কে জানত?

সোমবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৬টা ২০ মিনিটে বিমানে করে মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে জাকার্তা থেকে পাংকাল পিনাংয়ের উদ্দেশ্য রওনা হন। আকাশে ফ্লাই করার ১৩ মিনিটের মধ্যে বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ে এবং রাডার থেকে উধাও হয়ে যায়। এর আগে পাইলট বিপদ বুঝে দ্রুত কন্ট্রোল রুমকে মেসেজ দিলেও, কোনো ব্যবস্থা গ্রহনের আগেই বিমানটি সাগরে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। এতে করে রিজাল দম্পতি ও তাদের কন্যা সন্তান মৃত্যুমুখে পতিত হন। ১৮৯ জন আরোহীর কেউই প্রাণে বাঁচতে পারেননি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায়।
রিজাল গিলাংয়ের মত একই রকম আরো দুঃখজনক গল্পের জন্ম দিয়েছে প্লেন ক্র্যাশের ঘটনাটি। বিশেষ করে বিধ্বস্ত হওয়া বিমানের বিভিন্ন ধ্বংসাবশেষের মাঝে পাওয়া একটি ফোনের কাভার ছবি নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। ছবিতে দেখা যায় এক দম্পতি পরস্পরের হাত ধরে একটি সেতু পার হচ্ছেন। দুজনের গভীর প্রেম ও মমত্ববোধই উঠে এসেছে ছবি থেকে। পরে সেই ছবির দম্পতির পরিচয় উন্মোচিত হয়। ফোনটির মালিক ছিলেন ওয়াহজো নুগ্রোহানতরো। প্লেনে তিনি থাকলেও ছিলেননা তার স্ত্রী। দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন।
পরে তার ফোনের ব্যাক কাভারে পাওয়া যায় আলোচিত ছবিটি। বিবিসি অনলাইন ও এএফপির খবরে জানানো হয়, ইনস্টাগ্রামে ইনা ইয়ানিতা সাবিত্রী নামের এক নারীর অ্যাকাউন্টে ছবিটি পোস্ট করা ছিল। কিন্তু ওই নারী বিধ্বস্ত উড়োজাহাজে ছিলেন না, ছিলেন তাঁর স্বামী ওয়াহজো নুগ্রোহানতরো। ফোনটি তাঁরই। হয়তো ছবিটি এই দম্পতির অনেক পছন্দের ছিল, যে কারণে তা মুঠোফোনের পেছনের কাভারে ব্যবহার করেন ওয়াহজো।
জানা গেছে, বোয়িং-৭৩৭ ম্যাক্সের নতুন ভার্সনের বিমানটিতে আগে থেকেই যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল। তবে লায়ন এয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের পাইলট ও কো-পাইলট অভিজ্ঞ ছিলেন। ভারতীয় নাগরিক ছিলেন পাইলট ভাবইয়ে সুনেজা। তাঁর মৃত্যুর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে জাকার্তার ভারতীয় দূতাবাস। অথচ দেওয়ালি উৎসবে যোগ দেওয়ার জন্য দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল ৩১ বছর বয়সী এই পাইলটের। দিল্লিতে এই খবর জানার পর সুনেজার মৃত্যুর ঘটনায় পুরো পরিবারই ভেঙে পড়েছে। কেউ কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। শোকের মাতম চলছে সবার হৃদয়ে।
একই অবস্থা ইন্দোনেশিয়ার অনেক পরিবারের। স্বজন হারানোর ব্যথায় স্তব্ধ হয়ে গেছেন অনেকে। তাদের একজন মরতাদো কুরনিয়াওয়ান। কিছুদিন আগে বিয়ে করেন তিনি। তার স্ত্রী ছিলেন উড়োজাহাজে, অফিসের কাজে গিয়েছিলেন। সজল চোখে তিনি অপেক্ষা করছিলেন বিমানবন্দরে। স্ত্রীকে হারানোর শোকে বললেন, ‘তাঁকে ছাড়া আমি বাঁচব না, আমি তাঁকে ভালোবাসি। তাঁকে শেষ কথাটি বলেছিলাম, সাবধানে থেকো।’ এমনই অনেক হৃদয়বিদারী গল্পের উৎস হয়ে থাকল সেদিনের দুর্ঘটনাটি।

Related Post