বছর পাঁচ আগের কথা ৷ তখন আমি মিরপুর এক মাদরাসায় পড়ালেখা করি ৷ সকলেই প্রায় আমায় ভালবাসতেন, এবং তাদের মনের জমানো কথা, আমি অধমের সাথে ব্যক্ত করতেন ৷ বিশেষ করে শামীম সাহেব নামে একজন হুজুর ছিলেন ৷ যিনি আমায় অনেক আদর, স্নেহ, ভালবাসা দিতেন ৷ এবং কি সকল প্রকার কথাও আমার সাথে বলতেন ৷

একদিন কথায় কথায় হুজুর বলতে লাগলেন, শুন মুস্তাফিজ, তোকে একটা গল্প বলি ৷
আমি তো গল্পের কথা শুনেই আনন্দে আটখানা হয়ে গেলাম ৷ গল্প শ্রবণের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে বসলাম ৷ আনন্দে নেচে উঠলাম ৷ হুজুর বলতে লাগলেন, : বছর হল বিয়ে করেছি ৷ মাদরাসা হতে বেতন পাই, মাত্র বার হাজার টাকা ৷ বাসা ভারা পাঁচ হাজার টাকা ৷ খাবার তো মাদরাসা থেকেই নিয়ে যাই ৷ বাকি টাকা সংসারে ব্যয় করা হয় ৷ ( সেই দিন আর উস্তাদ বাসায় যায়নি, আমিই রাতের খাবারটা বেরে দিচ্ছিলাম আর হুজুর খাবার মুখে তুলতে তুলতে বলতে লাগলেন ) আমি যেই বাসায় ভাড়া থাকি, সেই বাসার আশপাশের সকল মহিলা, তোমার খালার কাছে দ্বীন শিখতে আসে ৷ এখনো আমাদের সন্তান হয়নি , তাই সারাটা সময় মহিলাদেরকে ধর্মের নানান বিষয় শিক্ষা দিতেই তোমার খালা ভালবাসে ৷ আবার তোমার খালার হাতের এবং মেশিনের নানান ধরণের কাজ জানা রয়েছে ৷ মহিলা মাদরাসার মেয়ে বলে কথা, তাই কম-বেশি সবই পারে ৷ আর সেই সুবাদেই একদিন সকল মহিলা তোমার খালাকে বলতে লাগল ৷ আচ্ছা আপা,আপনি তো মেয়েদের অনেক ধরনের কাপড় বানাইতে জানেন , তাহলে ভাই কে বলে একটা মেশিন কিনে নিয়েন ৷ আমরা সবাই আপনার এখান থেকেই কাপড় বানাব ৷ এতে করে আপনাদের সংসারে আরও আয়-উন্নতি হবে, অনেক টাকা আসবে, খুব আনন্দে চলতে পারবেন ৷ আমার বিবি তাদের কথাটা মেনে নিয়ে, সেই রাতে যখন আমি বাসায় গেলাম , আমার সামনে খাবার দিয়ে তোমার খালা বলতে লাগল ,আপনাকে একটা কথা বলি? আমি অনুমতি প্রধান করলাম ৷ তখন মহিলারা তাকে যা বলল আমাক তাই জানাল ৷ আমার হাতে ভাতের নলা ছিল ৷ নলাটা আর মুখে দিতে পারলাম না ৷ দু-চোখ দিয়ে আমার অঝোরে জল বের হতে লাগল ৷ তার কথাই খুবই হতাহত হলাম ৷ মনে মনে ভাবতে লাগলাম, আমি মনে হয় তোমার খালাকে সুখে রাখতে পারিনি ৷

তোমার খালা ব্যাপারটি বুজতে পারল , জানতে চাইল, সে কোন ভুল করেছে কিনা? ভাতের নলাটা রেখে চোখের পানি মুছে বললাম, বউ, আমি প্রতি মাসে বার হাজার টাকা বেতন পাই, এই টাকায় যদি তোমার খাওয়া-দাওয়া, ভরণপোষণ না হয়, তাহলে আমায় বলো, আমি রাতের আঁধারে ভ্যান চালিয়ে তোমার প্রয়োজন মিটাব৷ তারপরও তোমাকে কখনো কোন কাজ,বা চাকুরী করতে দিবনা৷ কেননা আল্লাহ পুরুষ হিসাবে আমাকে তৈরী করছে সংসারের সব দায়িত্ব দিয়ে ৷ এটা আমার দায়িত্ব, তুমি কেন কষ্ট করবে ? নারীরা শুধু সংসারটাকে সাজিয়ে-গুছিয়ে ভালবাসা দিয়ে ভরে রাখবে ৷ তোমার ভালবাসায় সংসারটা উজ্জল হয়ে উঠবে ৷ তুমি কেন কষ্ট করতে যাবে? যদি নারীকে ঐ রকম ভাবে রাখতে নাইবা পারি , তাহলে আমাকে বিয়ে করতে কে বলেছে ? কথা গুলি বলা শেষ করার আগেই তোমার খালা আমার পাঁয়ে পড়ে গেল৷ আর বলতে লাগল, জীবনে আর কখনো এমন কোন কথা বলবনা, যেই কথায় আপনার কলিজায় আঘাত লাগে ৷

আমার উস্তাদের মুখে এমন কাহিনী শুনে, আমার দু-চোখ অশ্রুতে ভিজে গেল। চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না৷ আর মনে মনে বলতে লাগলাম। এই না হয় সংসার,এই না হয় আদর্শ স্বামী ৷ এটাকেই বলে আদর্শ স্বামী ৷ আদর্শ স্বামী দেখতে হলে হুজুর মিয়ার বউকে দেখো ৷ হুজুর মিয়ার বউ ৷ আল্লাহ তাআলা সবাইকে এমন আদর্শ স্বামী হওয়ার তাওফীক দিন ৷ আমিন ৷

Related Post

Spread the love
  • 1.4K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.4K
    Shares