যা ঘটছে কঙ্গোর সোনার খনিতে..

সোনার দেশে দরিদ্র লোকের বাস। যদিও ভাবতে অবাক লাগে। কিন্তু ঘটনা সত্যি। কেননা সোনার খনিতে যারা কাজ করে তারা কেবলি দরিদ্র শ্রমিক। আর সোনালী জৌলুশপূর্ণ জীবন যাপন করে খনির বাইরে থাকা কর্তাবাবুরা আর রাষ্ট্রীয় কর্তপক্ষ। সেই পরিস্থিতি বদলানোর দায় কাদের, তা হয়ত জানাতে পারব না। কিন্তু জুমবাংলার ‘দৃশ্য অবলোকন’ পাতায় সোনার খনিতে সোনা উত্তলণের দৃশ্যগুলো দেখানোর ব্যবস্থাটুকু করা হলো।ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গো, সংক্ষেপে ডিআরসি৷ আফ্রিকার দেশটির উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রধান আয়ের উৎস সোনার খনি৷ শ্রমিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খনি থেকে সোনা আহরণ করে৷ বহু হাত ঘুরে, অবশেষে তা পরিণত হয় জ্বলজ্বলে সোনার বারে৷হাড়ভাঙা খাটুনি খনির অনেক গভীর থেকে নৈপুণ্যের সাথে মাটি থেকে সোনা আলাদা করছেন এক শ্রমিক৷ খনির দলে থাকেন দুই ধরনের শ্রমিক, যারা খনন করেন, এবং যারা সোনার আকর মাটির ওপরে নিয়ে আসেন৷ একজন শ্রমিককে দিনে ছয় থেকে আট ঘণ্টা খনিতে কাজ করতে হয়৷খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি এই খনিতে এক গ্রাম সোনার জন্য ২০০ কেজি আকরিক সংগ্রহ করতে হয়৷ ছোট ছোট সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে খনির মধ্য দিয়ে আসা যাওয়া করতে হয় শ্রমিকদের৷ মাটিভর্তি বস্তা আসছে, সেটি বয়ে নিয়ে যেতে হবে বাইরে৷ কৃষিকাজের পর সোনার খনিই শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস৷প্রতি বস্তায় ৩০ কেজি সোনার মাটিভর্তি বস্তা বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন একজন শ্রমিক৷ প্রতি বস্তা বহন করার জন্য একজন শ্রমিক পান ৫০০ কঙ্গোলিজ ফ্রাংক (প্রায় ২৫ টাকা) দিন শেষে কয়েকশ টাকা পান শ্রমিকরা৷ খনিতে সবচেয়ে কম বেতন পাওয়াদের মধ্যে আছেন এই বহনকারীরা৷ এদের বেশিরভাগই এসেছেন অন্য এলাকা থেকে৷

পাথরবেষ্টিত সোনা পাথর ও মাটির খাঁজে খাঁজে আটকে থাকে বিশুদ্ধ সোনা৷ সোনা আহরণের জন্য সেই পাথর ভেঙে টুকরো করতে হয়৷ এজন্যই আছে আলাদা শ্রমিক৷ মেশিনে নয়, প্রচণ্ড পরিশ্রমের এই পুরো কাজটাই হয় হাতে৷ এমন একটি প্লাস্টিকের গামলা থেকে সোনা আলাদা করতে সময় লাগে কয়েক ঘণ্টা৷দামি কাদা ভাঙা আকরিক পানিতে মিশিয়ে কাদা তৈরি করছেন একজন শ্রমিক৷ ঘনত্ব বেশি হওয়ায় শুধু সোনাই পড়ে থাকে নীচে, বাকি পানি ও মাটি চলে যায় গড়িয়ে৷ তারপর জমে থাকা সোনা পারদের সাহায্যে ছেঁকে তোলা হয় আরেক প্লাস্টিকের গামলায়৷এবার হবে বিক্রি খনির আশেপাশেই দোকান বসিয়ে এই অপরিশোধিত সোনা কিনে নেন কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ী৷ ছবিতে দেখা যাচ্ছে সোনা ও পারদের এক ধরনের ধূসর মিশ্রণ৷ ছোট ছোট খনি মালিকরা এই অপরিশোধিত সোনা বিক্রি করেন৷পরিশোধন প্রক্রিয়া বড় ব্যবসায়ীরা উত্তপ্ত চুলায় অপরিশোধিত সোনা নাইট্রিক অ্যাসিড দিয়ে গলিয়ে ফেলেন৷ উদ্দেশ্য, অপ্রয়োজনীয় জিনিস দূর করা৷ স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চেয়ে অনেক বড় পরিমাণে সোনার চালান দিয়ে থাকেন বড় ব্যবসায়ীরা৷ প্রতি সপ্তাহে বিক্রি হয় কয়েক কেজি সোনা৷ ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চেয়ে লাভের হার কম হলেও মাস শেষে আয়টা হয় বেশ বড়ই৷মূল্যবান গুড়া উত্তপ্ত সোনা ঠান্ডা হওয়ার পর একটি ইলেকট্রনিক দাঁড়িপাল্লায় মাপা হয়৷ এই পর্যায়ে এসে সোনা অন্তত ৯২ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পরিশোধিত হয়৷ অবশ্য অনেক ক্ষেত্রে তা নির্ভর করে কোন খনি থেকে আহরণ করা হয়েছে তার ওপর৷

আরো পরিশোধন এবার ১,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সোনা গলানো হয় আরেকটি উত্তপ্ত চুলায়৷ পরিণত করা হয় একটি মণ্ডে৷ গ্রাফাইট সোনার সাথে বিক্রিয়া করে না৷ তাই গ্রাফাইটের তৈরি একটি ছাঁচে ঢালা হয় তরল সোনা৷ কয়েক কেজি সোনা গলাতে লাগে মাত্র ২০ মিনিট৷ঠান্ডা হবার অপেক্ষা এতো উত্তপ্ত সোনা পুরোপুরি ঠান্ডা হতে সময় লাগাই স্বাভাবিক৷ কিন্তু এতো অপেক্ষার ধৈর্য আছে কার! এজন্য মোটামুটি ঠান্ডা হলেই ছাঁচ থেকে সোনা বের করে সরিয়ে রাখা হয় একপাশে৷ ধীরে ধীরে লাল থেকে হলুদ, হলুদ থেকে সোনালি, ফুটে ওঠে মূল্যবান এই ধাতুর আসল চেহারা৷সোনার বার এবার দেশবিদেশে রপ্তানি হওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত খনি থেকে আহরিত সেই সোনা৷ ছবির সোনার বারটির ওজন ৪ দশমিক তিন কেজি৷ প্রস্তুতের দিনে ইংল্যান্ডের লন্ডনে এর দাম ছিলো এক লাখ সাতষট্টি হাজার ডলার (প্রায় এক কোটি ৪১ লাখ টাকা)৷ বছরে প্রায় ১১ টনের মতো সোনা উৎপাদন করে কঙ্গো, কিন্তু এর বেশিরভাগই অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যায়৷ সরকারি হিসেবে ২০১৫ সালে মাত্র ২৫৪ কেজি সোনা রপ্তানি করেছে ডিআরসি৷

(Visited 98 times, 2 visits today)

Related Post

You may also like...