পবিত্র কোরআন মুখস্থ করার একদম সহজ ৯টি উপায়।

আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি সর্বোত্তম যে কোরআন শিখে ও অন্যকে শেখায়।” (সহীহ বুখারীঃ ৪৬৫৭)
আজ আমরা কিছু টিপস বা পরামর্শ জানবো, যার মাধ্যমে ঐশীগ্রন্থ পবিত্র কোরআন মাজিদ সহজে মুখস্থ বা হিফজ করা সম্ভব হবে-

(১) ইখলাস বা আন্তরিকতাঃ নিয়তে বিশুদ্ধতা আনা এবং উদ্দেশ্য সংশোধন করা কোরআন মুখস্থ করার প্রথম শর্ত। এটা অনেকটা এ রকম যে, আমি কোরআন মুখস্থ করব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্য। আখিরাতে জান্নাত লাভের মাধ্যমে সাফল্য অর্জনের জন্য। এছাড়া সেই সকল পুরস্কারও অর্জন করা, যা কোরআন তিলাওয়াতকারী ও মুখস্থকারীদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “অতএব, আপনি নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করুন। জেনে রাখুন, নিষ্ঠাপূর্ণ ইবাদত আল্লাহরই নিমিত্ত।” (সূরা আল-যুমারঃ ২-৩) অন্যত্র “বলুন আমি নিষ্ঠার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি।” (সূরা আল-যুমারঃ ১১) আর যারা শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য কোরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ করে তারা তো কোনো পুরস্কারই লাভ করবে না, বরং তাদেরকে এ ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, শুধুমাত্র দুনিয়ায় লাভের জন্য কোরআন মুখস্থ করা একটি পাপের কাজ।
(২) উচ্চারণ ও তিলাওয়াত শুদ্ধ করাঃ আন্তরিকতার পর কোরআন মুখস্থ করার প্রথম এবং অত্যাবশ্যকীয় ধাপ হলো শুদ্ধ উচ্চারণ। একজন ভালো তিলাওয়াতকারীর তিলাওয়াত শোনা ব্যতীত এটা সম্ভব নয়। এ কারণে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যিনি আরবদের মধ্যে বাগ্মীতায় শ্রেষ্ঠ ছিলেন। তিনিও হজরত জিবরাইল (আলাইহিস সালাম) এর সঙ্গে মুখে মুখে শিক্ষালাভ করেছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বছরে একবার হজরত জিবরাইল (আলাইহিস সালাম)-কে কোরআন তিলাওয়াত করে শুনাতেন এবং যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন সেই বছর শুনিয়েছিলেন দু’বার। একইভাবে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ও সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শিক্ষা দিয়েছেন মুখে মুখে। আর সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) পর যারা এসেছেন তারা সাহাবাদের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাছ থেকে এবং পরবর্তী প্রজন্মরাও শিখেছেন একইভাবে। তাই একজন ভালো তিলাওয়াতকারীর কাছ থেকে শিক্ষালাভ করা বাধ্যতামূলক। একইভাবে কারো আরবী ভাষা ও এর মূলনীতির ওপর দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র নিজের ওপর নির্ভর করে কোরআন মুখস্থ করা ঠিক নয়। কারণ, কোরআনে এমন অনেক আয়াত আছে যেগুলো আরবি ভাষার সাধারণ যে নিয়মসমূহ রয়েছে তার চেয়ে বিপরীতধর্মী।

(৩) মুখস্থ করার জন্য প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ নির্ধারণ করাঃ প্রতিদিন মুখস্থ করার জন্য কোরআনের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অংশ নির্ধারণ করা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নির্দিষ্ট সংখ্যক আয়াত কিংবা এক বা দুই পাতা। এমনকি এক পারার (সম্পূর্ণ কোআনের ১/৩০ ভাগ) এক অষ্টমাংশও হতে পারে। তাই তিলাওয়াত শুদ্ধ ও মুখস্থ করার অংশ নির্ধারণ করার পরই কাজ শুরু করা উচিত। মুখস্থ করার সময় উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে প্রথমত সুন্নাহর অনুসরণ করা হবে। দ্বিতীয়ত মুখস্থ হবে দৃঢ় ও স্থায়ী। উচ্চস্বরে তিলাওয়াত শ্রুতিমধুর এবং মুখস্থ করার ক্ষেত্রেও সাহায্যকারী। অধিকন্তু জিহ্বা প্রতিবার একটি নির্দিষ্ট স্বরে ফিরে আসে এবং তা পরিচিত হয়ে উঠে। যার ফলে, স্বরের তারতম্য থেকে সহজেই ভুলত্রুটি শনাক্ত করা যায়। এসবের মূল কারণ, সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করা নবীজিরই নির্দেশ। আর এ নির্দেশ অমান্য করা অসম্ভব।

(৪) একটি নির্দিষ্ট অংশ নিখুঁতভাবে মুখস্থ না করে অন্য অংশ শুরু না করাঃ একটি নির্দিষ্ট অংশ নিখুঁতভাবে মুখস্থ না করে অন্য অংশ শুরু করা কখনই ঠিক নয়। আর এটা করার কারণ, যা আপনি মুখস্থ করেছে তা যেন আপনার অন্তরে পুরোপুরি গেঁথে যায়। এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করতে পারে আপনার দৈনন্দিন জীবনের কার্যকলাপ। আপনি যা শিখছেন তার চর্চা করতে পারেন সালাত আদায়ের সময় কিংবা সালাতের জন্য অপেক্ষা করার মুহূর্তে। আর এভাবে আপনার মুখস্থ করার কাজটি হয়ে উঠবে আরও সহজ। যদি কোনো অংশ শুরু করার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা সম্ভব না হয় তবে অবশ্যই উচিত হবে যতটুকু সময় প্রয়োজন, ততটুকু সময় নিয়েই সম্পন্ন করা।

(৫) মুখস্থ করার সময় কোরআনের একটি নির্দিষ্ট মুসহাফ (কপি) ব্যবহার করাঃ যে সব উপকরণ একজন শিক্ষার্থীকে কোরআন মুখস্থ করার ব্যাপারে সাহায্য করে। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোরআনের একটি নির্দিষ্ট মুসহাফ ব্যবহার করা। যা কখনই পরিবর্তন করা ঠিক নয়। এর কারণ, শোনা ও পড়ার পাশাপাশি দেখাও কোরআন মুখস্থ করার ব্যাপারে সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি নির্দিষ্ট মুসহাফ ব্যবহার করে পড়ার ফলে তার লেখার ধরণ, আয়াতের গঠন এবং অবস্থান শিক্ষার্থীর অন্তরে একটি কাল্পনিক ছাপের সৃষ্টি করে। একজন শিক্ষার্থী যদি মুখস্থ করার সময় ভিন্ন ভিন্ন মুসহাফ ব্যবহার করে তবে সেগুলোতে লেখার ধরণ, আয়াতের সংখ্যা ও অবস্থানও ভিন্ন ভিন্ন হয়। এতে মুখস্থ করার কাজটি কঠিন হয়ে পড়ে। আর এ কারণে একজন শিক্ষার্থীর উচিত একটি নির্দিষ্ট মুসহাফ ব্যবহার করা এবং সেটি কখনই পরিবর্তন না করা।

(৬) একটি সূরার বিভিন্ন অংশ মুখস্থ করে পুরো সূরাটি সম্পূর্ণ না করে অন্য সূরায় না যাওয়াঃ একটি সূরার বিভিন্ন অংশ (বিশেষ করে বড় সূরাগুলোর) মুখস্থ করার পর সেগুলো এক করে সম্পূর্ণ সূরাটি মুখস্থ করার কাজ নিখুঁত না করে অন্য সূরা শুরু করা কখনই ঠিক নয়। তার মুখস্থ করার কাজটি এমন নিখুঁত হওয়া উচিত, যাতে কোনো প্রকার বাঁধা ছাড়াই সম্পূর্ন সূরাটি এক টানা বলে যেতে পারেন। অর্থাৎ তার তিলাওয়াত হবে বাঁধাহীন স্রোতের মত, তার মস্তিষ্ক অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকলেও তার তিলাওয়াতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। থাকবে না কোনো জড়তা কিংবা দ্বিধা, ঠিক আমরা যেভাবে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করে থাকি। যদিও কোরআনের সবগুলো সূরা, সূরা ফাতিহার মত মুখস্থ করা সম্ভব নয়। তবুও আমাদের নিয়ত রাখতে হবে সূরা ফাতিহার মত করা। আর নিয়মিত তিলাওয়াত করে যেতে হবে প্রতিটি সূরা।

(৭) অন্যকে তিলাওয়াত করে শোনানোঃ কোরআন মুখস্থ করার ব্যাপারে একজন শিক্ষার্থীর শুধুমাত্র নিজের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। বরং আপনার উচিত কোনো হাফেজকে যা মুখস্থ করা হয়েছে তা তিলাওয়াত করে শুনানো। এতে আপনার ভুল-ভ্রান্তিগুলো পরিষ্কার হয়ে উঠবে। আর নিজের ভুল নিজে খুঁজে পাওয়া কতটা কষ্টকর তা আমাদের সবারই জানা।
(৮) যা মুখস্থ করা হয়েছে তা নিয়মিত তিলাওয়াত করাঃ মুখস্থ করার বিভিন্ন উপকরণ যেমন, কবিতা বা গল্প ইত্যাদি থেকে কোরআন মুখস্থ করার ব্যাপারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর এর কারণ, কোরআন মানুষের মস্তিষ্ক থেকে খুব তাড়াতাড়ি মুছে যায়। আর এ কারণেই নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “যে ব্যক্তি অন্তরে কোরআন গেঁথে (মুখস্থ) রাখে তার উদাহরণ হচ্ছে ঐ মালিকের মত, যে উট বেঁধে রাখে। যদি সে উট বেঁধে রাখে, তবে সে উট তার নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু যদি সে বন্ধন খুলে দেয়, তবে তা আয়ত্তের বাইরে চলে যায়।” (সহীহ বুখারীঃ ৪৬৬১) তিনি আরও বলেন, “আল্লাহর কসম! যার কব্জায় আমার জীবন। এই কোরআন বন্ধনমুক্ত উটের চেয়েও দ্রুত বেগে দৌঁড়ে যায়।” (সহীহ বুখারীঃ ৪৬৬৩) এর দ্বারা বোঝা যায়, কোরআন মুখস্থ করার পর নিয়মিত তিলাওয়াত করা একটি আবশ্যিক কাজ।

(৯) কোরআনের (প্রায়) একই রকম আয়াতগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকাঃ শব্দ, অর্থ কিংবা আয়াতের গঠনের দিক দিয়ে কোরআনের বিভিন্ন অংশে মিল রয়েছে। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ উত্তম বাণী তথা কিতাব নাজিল করেছেন, যা সামঞ্জস্যপূর্ণ, পুণঃপুণঃ পঠিত। এতে তাদের লোম কাঁটা দিয়ে উঠে চামড়ার ওপর। যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করে। এরপর তাদের চামড়া ও অন্তর আল্লাহর স্মরণে বিনম্র হয়।” (সূরা যুমারঃ ২৩)
পবিত্র কোরআনে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার আয়াত রয়েছে। আর এদের মধ্যে প্রায় এক হাজার আয়াত রয়েছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে যাদের পারস্পরিক মিল রয়েছে। কখনও তাদের মধ্যে মাত্র এক বা একাধিক শব্দের পার্থক্য দেখা যায়। তাই একজন শিক্ষার্থীর উচিত এ ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা। একজন শিক্ষার্থীর মুখস্থের সর্বোচ্চ সৌন্দর্য নির্ভর করে এই একই রকম আয়াতগুলো সতর্কতার সঙ্গে মুখস্থ করার ওপর।

তাই প্রতিটি মানুষের উচিত জীবনের শুরু সময়টাতে নিজেকে কোরআন মুখস্থ করার কাজে জড়িত রাখা। কোনো এক মনীষী বলেছিলেন, ‘যুবক বয়সে মুখস্থ করা হচ্ছে অনেকটা পাথরে খোদাই করার মত। আর বৃদ্ধ বয়সে মুখস্থ করা অনেকটা পানিতে খোদাই করার মত।’ তাই আমাদের সবারই উচিত জীবনের সোনালী সময়টাকে কাজে লাগানো এবং এ ব্যাপারে অন্যকে উৎসাহিত করা। মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর অমূল্য বাণীগ্রন্থ মুখস্থ করে তদানুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আল্লাহুম্মা আমিন।

(Visited 1,808 times, 1 visits today)

Related Post

You may also like...