মাছ ধরতে কে না পছন্দ করে। এখনো অনেকেই সময়-সুযোগ পেলেই ছিপ দিয়ে বসে যায় মাছ ধরতে। কেউ কেউ তো আবার খাবারের থেকে মাছ শিকার করতেই বেশি পছন্দ করে। ভৌগলিক কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মাছ ধরার বিভিন্ন পদ্ধতি বা উৎসব চালু রয়েছে। তবে এদের মধ্যে কয়েকটি পদ্ধতি সত্যিই অবাক করার মতো। চলুন জেনে আসি সেই পদ্ধতিগুলো- এন্টোগো উৎসব- আফ্রিকার মালিতে প্রতিবছর মে মাসের নির্দিষ্ট এক শনিবার আয়োজন করা হয় অদ্ভুত এক মাছ ধরার উৎসবের। এই উৎসবে বামবাগানের বড় এক হৃদের মাছ মাত্র ১৫ মিনিটেই নিঃশেষ হয়ে যায়। ১৫ মিনিটে একটি হৃদের মাছ কীভাবে নিঃশেষ হয়ে যায় তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। বহু বছর ধরে উদযাপিত এই উৎসবে বামবাগান ছাড়া আশেপাশের বহু গ্রামের মানুষজন আসে মাছ শিকার করতে। সবাই হৃদের পাশে আসার পর একজন দলপতির আদেশে শুন্যে গুলি ছোঁড়া হয় এবং এরপরেই সেই হৃদটিতে মানুষের ঢল নেমে যায় এবং শুরু হয় মাছ শিকার। শুষ্ক মৌসুমে যখন চারিদিকে খাদ্য সঙ্কট তখন এই উৎসবের মাছ প্রত্যেকটা পরিবারে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেয়। এছাড়া এ হৃদে সারাবছর মাছ ধরা একদম নিষিদ্ধ। তারা বিশ্বাস করে পবিত্র এই হৃদটিতে অনেক শুভ আত্মা বাস করে যারা কিনা সারাবছর তাদের জন্য মাছ মজুদ করে রাখে এবং তাদের মধ্যে এই কুসংস্কারও প্রচলিত আছে যে মহিলা মানুষের সংস্পর্শে এই হৃদ অপবিত্র হয়ে যাবে। তাই মাছ ধরার এই উৎসবে মহিলারা শুধু দর্শকমাত্র।

লামালিরাদের তিমি শিকার- ইন্দোনেশিয়ার লামালিরা গ্রামের মানুষ এমন এক পদ্ধতিতে তিমি শিকার করে যা সত্যিই রোমাঞ্চকর। দূর্গম এই দ্বীপের মানুষ ঐতিহ্য এবং জীবিকার তাগিদে তিমি শিকার করে আসছে প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে। এই পদ্ধতিতে একটি বাঁশের আগায় লোহার ফলা বাঁধানো থাকে। দড়ির এক প্রান্ত এই ফলা এবং অন্য প্রান্ত বাঁধা থাকে নৌকার সাথে। তাই একবার যদি এই ফলা কোনো তিমির গাঁয়ে গেঁথে দেয়া যায় তাহলে নৌকা এই তিমির সঙ্গেই চলতে শুরু করবে। যারা তিমির গায়ে এই বর্ষাগুলি পূর্ণ দক্ষতায় গেঁথে দেয় তাদেরকে বলা হয় লামাফা। ভাগের একটা বড় অংশ তাদেরকেই দেয়া হয় কারণ তাদের নিশানা এবং দক্ষতার উপর নির্ভর করে গ্রামের মানুষের এক বছরের খাদ্যের প্রশ্ন। লামালিরার গ্রামবাসীরা বছরের কয়েকটা সময় নিরুপায় হয়ে তিমি শিকার করতে যায়। কারণ এই অভিযানের পদে পদে থাকে মৃত্যুর ঝুঁকি। প্রথমত তাদের ৪০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার সমুদ্রপথ পাঁড়ি দিয়ে গভীর সমুদ্রে যেতে হয়। কখনো আবার তিমির গাঁয়ে ফলা গেঁথে দেয়ার পর তিমি বাঁচার জন্য গভীর সমুদ্রে ডুব দেয় তখন ফলার দঁড়ি কাটতে দেরি করলে নৌকাও তলিয়ে যায় সমুদ্রে। আবার কখনো একটি তিমিকে আঘাত করে করে কাবু করতে সময় লেগে যায় প্রায় ১০ ঘন্টা। সেখানে জেলেদের অসীম ধৈর্য্য’র পরীক্ষা দিতে হয়। ১৯৮৬ সালের পর থেকে তিমি শিকার বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ হয়। শুধুমাত্র লামালিরাবাসীদের তিমি শিকারের বৈধতা দেয়া হয়েছে তাদের ঐতিহ্য এবং জীবিকার কারণে।

আইস ফিশিং- আমরা তো খুব সহজেই ছিপ বা জাল দিয়ে মাছ ধরতে পারি। কিন্তু যেসব দেশে শীতের সময় জলাশয়ের পানি বরফে ঢেকে যায় তারা আইস ফিশিং পদ্ধতিতে মাছ শিকার করে। আইস ফিশিং বা বরফ কেটে মাছ শিকার বহু বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্য। বরফ কেটে মাছ শিকারের নিয়মটা হলো প্রথমে বরফে একটি গর্ত করতে হয় তারপর এক বা একাধিক ছিপ পেতে বসে থাকতে হয়। আর এই গর্তের আকার নির্ভর করে কী ধরনের মাছ শিকার করা হয় তার উপর। আইস ফিশিংয়ের শিকারিরা মাছ শিকারের সময় হিটার বহন করে। কারণ এই হিটার একদিকে যেমন স্থানটি গরম রাখে অন্যদিকে গর্তটিকে আবার জমে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। যখন তাপমাত্রা মাইনাস ৩০ ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে যায় তখন গর্তটির অস্তিত্ব রক্ষা করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে। আমেরিকার ব্রেইনার্ড লেকে প্রতিবছর জানুয়ারী মাসে আইস ফিশিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রায় ১৫ হাজার মানুষ সেই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ বড় মাছ ধরা ছাড়াও নানান ক্যাটাগরিতে প্রদান করা হয় অসংখ্য পুরষ্কার। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও কানাডা ও সাউথ কোরিয়াতে বহু বছর ধরে এই আইস ফিশিং প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়৷

আমা ডাইভিং- সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যগত দিক থেকে জাপান অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী একটি দেশ। আমা ডাইভিং জাপানের প্রায় ২ হাজার বছরের ইতিহাস বহন করে। এখানে আমা শব্দের অর্থ সমুদ্রকন্যা। এটি মাছ এবং জলজ প্রাণী শিকারের সুপ্রাচীন জাপানি পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে হাতে একটি অস্ত্র নিয়ে সমুদ্রে ডুব দিয়ে শিকার করতে হয়। থাকে না কোনো নিরাপত্তা বা অক্সিজেনের কোনো ব্যবস্থা। তাই এটা বেশ বিপজ্জনকও বটে। পূর্বে শুধুমাত্র মেয়েরাই আমা ডাইভিং করতো। ১২ বা ১৩ বছর বয়সের পর থেকে তাদের এই চর্চা শুরু হয়। দ্বীপগুলোতে এমন নিয়ম প্রচলিত ছিলো যে আমা ডাইভিং না পারলে সেই মেয়েদের বিয়ে হতো না। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আমা ডাইভাররা সাদা পোশাক পরতে শুরু করে এবং এর আগে তারা কোনো পোশাকই পরতো না। বর্তমান সময়ে এসে মানুষ এই সনাতন পদ্ধতি থেকে মুখ সরিয়ে নিচ্ছে। ১৯৪০ সালেও আমা ড্রাইভারের সংখ্যা ছিলো ৬ হাজারের মতো। আর বর্তমানে এর সংখ্যা মাত্র ৭০ জনের মতো।

শ্রীলঙ্কায় খুঁটি পুতে মাছ শিকার- শ্রীলঙ্কার কঙ্গোলা দ্বীপ ছাড়াও আরো কয়েকটি দ্বীপে খুঁটি পুঁতে মাছ শিকার করার ঐতিহ্য প্রচলিত আছে। প্রায় শত বছর ধরে চলে আসা এই পদ্ধতিতে প্রথমে সমুদ্র উপকূলের অল্প পানিতে বড় একটি খুঁটি শক্ত করে পুঁতে দিতে হয় যার উপরে ছোট্ট একটি বসার জায়গা তৈরি করা হয় যাতে করে সেখানে বসে একজন মানুষ খুব সহজেই ছিপ দিয়ে মাছ শিকার করতে পারে। এই পদ্ধতিটি খুব বেশি লাভজনক নয় তবে খুব সহজেই ছোট্ট একটি পরিবারের দিন চলে যায়। ২০০৪ সালের সুনামিতে এই দ্বীপগুলির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর থেকে এই পদ্ধতিতে মাছ ধরা অনেকটাই কমে গেছে যার ফলে জেলেরাও আস্তে আস্তে অন্য পদ্ধতি এবং অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে।

Related Post