আমরা যদি না জাগি মা ক্যামনে সকাল হবে?

ছবিতে একটা লালরঙা বাস হলদেটে চোখ পাকিয়ে তাড়া করছে একদল শিশুকে। বাসটির হাঙরের মতো দাঁত। সেই দাঁতের ফাঁকে আটকা পড়েছে একটি শিশু। তবু থামছে না বাস। সে ছুটছে তো ছুটছেই। আর পেছনে দাঁড়িয়ে হাসি-হাসি মুখে পুরো ঘটনা দেখছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। মন্ত্রী বলছেন, ‘আমার নতুন উদ্ভাবন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ’।

গত রোববার বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ কোনো এক শিক্ষার্থীর আঁকা ওই ছবি এখন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা তাদের বন্ধু হত্যার বিচার চায়। কথা বলে জানা গেছে, এই শিক্ষার্থীদের কোনো নেতা নেই, কোনো পক্ষের উসকানিও নেই। জনমত তৈরিতে স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে, প্রচারের কাজে ব্যবহার করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক। এসব স্লোগানের মূল কথা হলো, ‘সড়কে নিরাপত্তা চাই’।

দুই শিক্ষার্থী হত্যার বিচারসহ নিরাপদ সড়কের দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার তৃতীয় দিনের মতো রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে নেমে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করে। তারা প্ল্যাকার্ডে লিখেছে, ‘আমরা যদি না জাগি মা ক্যামনে সকাল হবে?’ সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে এক ছাত্রী এক টুকরো কাগজে স্লোগান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ‘আর কত লাশের বিনিময়ে শান্তি আসবে?’ তারা চিৎকার করে জানতে চেয়েছে, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?’

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের প্রচারে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের কথা বলেছে, আর শূন্যস্থানে জিজ্ঞাসা চিহ্ন দিয়ে জানতে চেয়েছে, মৃতদের তালিকায় এরপর কার নাম যুক্ত হচ্ছে। ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে গত এপ্রিলে দুই বাসের রেষারেষিতে প্রথমে হাত ও পরে প্রাণ হারানো কলেজছাত্র মো. রাজীব হোসেন। আরও আছে হানিফ পরিবহনের গাড়িচালক, তাঁর সহকারী ও সুপারভাইজার মিলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ছাত্রকে খুন করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে, সেই সাইদুর রহমানের (পায়েল) ছবি। এ দুই ছবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, রোববার নিহত দুই কলেজ শিক্ষার্থী দিয়া খানম (মীম) ও আবদুল করিমের (রাজীব) ছবিও।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ১৬-১৭ বছরের দুই শিক্ষার্থীর যাওয়া-আসা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন তাদের বাবা-মায়েরা। সেই বাবা-মায়েদের উদ্দেশে শিক্ষার্থীরা ফেসবুক ও প্ল্যাকার্ডে লিখেছে, ‘মা, ওরা বাস আর দেওয়ালটার মাঝখানে আমার জন্য জায়গা রাখল না’, ‘মা তুমি আর অপেক্ষা করে থেকো না, আমি আর ফিরব না’। মায়ের উদ্দেশে রাস্তায় নেমে আসা শিক্ষার্থীরা প্ল্যাকার্ডে লিখেছে, ‘আমরা যদি না জাগি মা ক্যামনে সকাল হবে?’।

শিক্ষার্থীদের স্লোগান, ‘ওরা ভয়ানক, বেপরোয়া যানচালক/ওরা আমাদের পিষে মারবে, ধাক্কা দিয়ে খাদে ফেলে দেবে/উঠতে গিয়ে আহত হলে নদীতে ছুড়ে ফেলবে-কিন্তু ওদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।’ তারা লিখেছে, ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’, ‘সড়ক দুর্ঘটনার নামে গণহত্যা বন্ধ কর’, ‘অসতর্ক ড্রাইভিংকে না বলুন/ড্রাইভারকে সতর্ক করুন’, ‘বি দ্য চেঞ্জমেকার টুডে অর বি দ্য ভিকটিম টুমরো’-এর বাংলা করেছে ‘পরিবর্তনের এখনই সময়/এখন নয় তো কখনোই না’, ‘সড়কে হত্যার একমাত্র শাস্তি, ফাঁসি চাই’।

নিরাপদ সড়ক দাবির এই আন্দোলন থেকে যাঁরা শিক্ষার্থীদের সরে যেতে বলেছেন, তাঁদেরও সমালোচনা করেছেন আন্দোলনকারীরা। গতকাল আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে যাঁরা মুঠোফোনে ভিডিও করে নানা বার্তা দিচ্ছেন, তাঁদের রাজপথে নামতে বলেছেন। তারা প্ল্যাকার্ডে বলেছে, ‘আমরা নয় টাকায় এক জিবি চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই’।

তবে, শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের ওপর। তারা একটি ছবিতে বাসের গায়ে টুথপেস্টের মোড়ক সেঁটেছে, পাশে ছবি দিয়েছে নৌপরিবহনমন্ত্রীর। স্লোগান লিখেছে, ‘দায়িত্বশীল মন্ত্রী চাই’, ‘শাজাহান খানকে ক্ষমা চাইতে হবে’।

গতকাল নাবিস্কো মোড়ে লম্বা সময় যান চলাচল বন্ধ করে রেখেছিল সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি ও সরকারি বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের সবাই নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্যে ব্যথিত। একজন ছাত্র বললেন, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কোনো উদ্যোগ তো নেননি, উল্টো ভারতের মহারাষ্ট্রে ৩৩ জনের মৃত্যুর প্রসঙ্গ টেনে বিদ্রূপ করেছেন শিক্ষার্থীদের। যত দিন দাবি মানা না হবে, তত দিন আন্দোলন সংগ্রাম চলবে, তত দিনই শাজাহান খান থাকবেন প্ল্যাকার্ডে-স্লোগানে।

Related Post