উবারে বাইক চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা নারী বাইকচালক শাহনাজ আক্তার পুতুলের চুরি হওয়া স্কুটি মোটরবাইকটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে অভিযান চালিয়ে নারায়নগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে মোটরবাইকটি উদ্ধার করা হয়। এ সময় প্রতারক জনিকে আটক করা হয়েছে। তাকে ঢাকা এনে শেরেবাংলা নগর থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

তেজগাঁও জোনের সহকারী কমিশনার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন ডেইলি বাংলাদেশকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে চাকরি দেয়ার কথা বলে রাজধানীর খামারবাড়ি থেকে স্কুটি বাইকটি নিয়ে পালিয়ে যায় জনি নামের ওই যুবক। পরে ওই ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় জিডি করেন শাহনাজ। জিডি নম্বর ৯১১। এদিকে, শাহনাজের বাইক ফিরে পাওয়ার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ধন্যবাদের জোয়ার বইছে। সাব্বির আহমেদ নামে একজন লিখেছেন, বাংলাদেশের পুলিশ চাইলেই সব পারে। এদেশের হিরো হলো পুলিশ। ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশ। জয় বাংলা। ফাতেমা তুজ জোহরা লিখেছেন, ধন্যবাদ বাংলাদেশ পুলিশকে। নারীদের জয়গান হোক সবখানে। বেঁচে থাকুক ভালোবাসা।

####যেভাবে চুরি হয় শাহনাজের বাইক####বাইক চুরির ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শাহনাজ বলেন, গতপাঁচ দিন আগে জনির সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি নাকি বাইকের পার্মানেন্ট ট্রিপ মারেন। উনি আমাকে বলতেছিলেন যে আপা আপনি পার্মানেন্ট ট্রিপ মারতে পারেন না? -আমি বললাম, খুঁজিতো আমি এগুলা পাইনা ভাই। আপনার কাছে আছে নাকি? – উনি বললো, আমিতো পার্মানেন্ট মারি। -জিজ্ঞেস করলাম, ভাই এটার সিস্টেম কি? – উনি বলেন, উনি কয়েকজন ড্রাইভার ঠিক করে রাখেন। যখন স্যার ম্যাডামদের সিরিয়াস দরকার হয় তখন তাদের ট্রিপ দেন। -আমি বললাম, টাকা পয়সা দেয় কিভাবে? –বলে, ধরেন খামার বাড়ি থেকে উত্তরা এয়ারপোর্ট যাবেন আবার নিয়ে আসবেন। আসার পর আপনার ডিউটি শেষ। আপনাকে তেলের খরচসহ ১২০০ টাকা দিয়ে দেবে।
-বললাম, এরকম হইলে তো ভালই হয়। দুই ঘণ্টা সময় দিয়ে যদি আমার ১ হাজার টাকা আয় হয় তবে আমারতো ভাল।’ শাহনাজ বলেন, ‘পরের দিনে উনি আমাকে ফোন দিয়ে বললেন আপনার গাড়ির কাগজের একটা কপি নিয়ে এসে আমার সাথে দেখা করেন। এরপর ২ দিন আগে আমি তার সাথে দেখা করে গাড়ির কাগজপত্র দিয়ে দেই। আজকে (মঙ্গলবার) সকালে আমি আমার বড় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়েছিলাম দুপুরে। এ সময় জনি (যিনি বাইকটি ছিনতাই করেছে) আমাকে কয়েক বার ফোন দিয়েছে। আমি বললাম, ভাই কি হয়েছে। উনি বললেন, আপনার চাকরি হয়ে গেছে, আপনি দ্রুত বাইক নিয়ে খামার বাড়ি চলে আসেন। এরপর আমি খামার বাড়ি চলে আসি। তখন উনি অনেকটা রাগ করে আমাকে বলেন, আপনার আসতে এত দেরি হল কেন। ম্যাডামতো দেরি দেখে অন্য রাইডার নিয়ে চলে গেছে তবে উনি বললেন, যাক সমস্যা নাই, চাকরি হয়ে গেছে আপনার এই খামার বাড়িতে।
তারপর উনি বললেন, আমাকে এখন অফিসের কাজে বিমানবন্দরে যেতে হবে। আপনি আমাকে নিয়ে চলেন। আপনার যে ভাড়া দৈনিক দেবার কথা সেটাই আপনি পাবেন। এরপর তিনি আমার বাইকে চড়ে বিমান বন্দরে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি তার ল্যাপটপের ব্যাগ আমার কাছে রেখে একটা অফিসে ঢুকে কি যেন কাজ করে আবার বের হয়ে এলেন। এসেই আমাকে বললেন চলেন এখানকার কাজ শেষ। এরপর আসার সময় তিনি আরও অন্য একটা অফিসে ঢুকে ১০ মিনিট কাজ করে বের হয়ে এলেন। বেলা তিনটার দিকে আবারো আমার বাইকে চড়ে খামার বাড়ি মোড়ে এলেন। এরপর তিনি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে কাকে যেন ফোন করে বললেন দ্রুত আজকের বাইকের বিলের কাগজটা নিয়ে আসো তো। ফোন রেখে দিয়ে তিনি আমাকে বললেন চলেন চা খাই। আমরা সংসদ ভবনের সামনের টিএন্ডটি মাঠের পাশের একটা চায়ের দোকানে চা খাই। তারপর উনি আমাকে বললেন, চলেন কাওরান বাজারে যাব একটা কাজ আছে। আপনি ভাড়া পাবেন। আমি বললাম ভাই আমার গাড়িতে তো তেল নেই। উনি বললেন সমস্যা নাই আমি তেল কিনে দিচ্ছি। তখন আমি বাইকে চাবি দিয়ে চালাতে যাব, এমন সময় উনি বললেন আপনাদের এই বাইক কিভাবে চালায় দেখিতো.. বলে তিনি আমার বাইকে বসে ক্লাস চালু করলেন।আমি বললাম আমার বাইকে এভাবে টানলে কাজ হবে না। এমন সময় উনি বাইকের ক্লাস টেনে জোরে একটা টান দিলেন। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফাঁকা রাস্তায় হাওয়া হয়ে গেলেন। আমি পাগলের মত পিছনে দৌড়ালাম, কিন্তু তার আর দেখা পাই না। আমি দ্রুত তখন দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকে বললাম। পুলিশ আমাকে থানায় পাঠালো। আমি থানায় গিয়ে একটা জিডি দায়ের করেছি। কাঁদতে কাঁদতে ওই নারী বলেন, আমার দুইটা মেয়ের পড়ালেখা আমার সংসার সব কিছুই এই বাইকের উপার্জনের টাকায় চলে স্যার। আমার বাইকের টাকা এখনো শোধ করতে পারি নাই। এই বিষয়ে গৃহিত পদক্ষেপের কথা জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের সিনিয়র সহকারি পুলিশ কমিশনার (এসি) আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আরিফ বলেন, এরই মধ্যে শাহনাজের অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে থানায়। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করবো। আজ রাতের ভেতরে সবদিকে তল্লাশি করে বাইকটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।

দুই মেয়েকে নিয়ে মা–বোনদের সহায়তায় দিন যাচ্ছিল তার। এক মেয়ে নবম ও এক মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। খুবই কষ্টে দিন যাচ্ছিল। অগত্যা বাইক নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন জীবন সংগ্রামে। শাহনাজ সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। রাজধানীর মিরপুরেই জন্ম শাহনাজের। তিনি জানালেন বাবা নেই, মা আর বোনেরা আছেন। শাহনাজ জানালেন, ২০০০ সালে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন শাহনাজ। কিন্তু দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি, ছাড়াছাড়িও হয়নি। শেরেবাংলা নগর থানার ওসি জিজি বিশ্বাস বলেন, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে ওই নারীর একটি স্কুটি চুরি হয়েছে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে।

Related Post

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •