রাজধানীর উত্তরার আশকোনার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব হাজি আবদুস সাত্তার। আজ (শুক্রবার) জুমার নামাজ পড়ে বাসায় ফিরে নিজ কক্ষে গিয়ে বসেন। ছেলেমেয়েরা লক্ষ করলেন, তিনি কাঁদছেন। বাবাকে কাঁদতে দেখে ভয় পেয়ে গেলেন তারা। পরে বাবার সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলেন- তিনি (আবদুস সাত্তার) যে হৃদরোগের চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত চিকিৎসা নিতেন সেই চিকিৎসক ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটুর মৃত্যু হয়েছে। এ সংবাদ শুনে তিনি কাঁদছেন।

আবদুস সাত্তার ছেলেমেয়েদের জানালেন, তাদের বাবা দীর্ঘদিন যাবৎ হৃদরোগের সমস্যায় ভুগছেন। বারডেম হাসপাতালে স্ট্যান্টিং (রিং পরানো) অস্ত্রোপচারের পর বলতে গেলে গত প্রায় ১০বছর ডা. লিটুর কাছেই চিকিৎসা নিতেন। তার কথাবার্তায় ভরসা পেতেন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ছুটতেন ডা. লিটুর চেম্বারে। বিদেশে থাকার কারণে ছেলেমেয়েরা অন্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে চাইলেও আবদুস সাত্তার রাজি হতেন না। আকস্মিকভাবে ডা.লিটুর মৃত্যুতে তিনি মুষড়ে পড়েছেন বলে জানালেন। শুধু বৃদ্ধ আবদুস সাত্তার একাই নন, ডা.লিটুর মৃত্যুতে অসংখ্য রোগী নীরবে চোখের জল ফেলছেন। শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটতে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ল্যাবএইড হাসপাতালের মুখপাত্র সাইফুর রহমান লেলিন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মাল্টি অরগান ফেইলিউর (হৃদরোগ, কিডনি, লাং ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা) নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু। মানবদরদি এই চিকিৎসক চেম্বারে প্রতিদিন যত রোগী দেখতেন তার অধিকাংশের কাছ থেকেই ফি নিতেন না। বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ভিজিটে এসে যেসব ওষুধ দিতেন তা রোগীদের মধ্যে বণ্টন করে দিতেন। বহু দরিদ্র হৃদরোগীর জটিল অস্ত্রোপচার বিনা পারিশ্রমিকে করে দিয়েছেন। অসংখ্য রোগীকে বাড়ি ফেরার টাকা পকেট থেকেও দিয়ে দিতেন। দরিদ্র রোগীদের কল্যাণের জন্য উদ্যোগী হয়ে গঠন করেছিলেন পেসেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনের মহাসচিব হিসেবে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজের হৃদরোগের এই অধ্যাপক স্বপ্ন দেখতেন এ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে দেশের হৃতদরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার খরচ মেটানোর। তিনদিন আগে গত ১৫ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনি লিখেছিলেন ‘ গরিব রোগীদের চিকিৎসা ও অধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের সংগ্রাম চলছেই, চলবে। এই সংগ্রামে সমাজের সব পেশার বিবেকবান মানুষদের পাশে চাই। আপনার একদিনের সিগারেটের টাকা একজন হৃতদরিদ্র রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।’ আজ (শুক্রবার) সকাল ১০টায় পেসেন্ট ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে উত্তরা সাত নম্বর সেক্টরে রবীন্দ্র সরণিতে দুঃস্থ রোগীদের জন্য ফ্রি চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণের আয়োজন করেছিলেন তিনি। কিন্তু অনুষ্ঠানের দিনই তিনি মৃত্যুর হিমশীতল কোলে ঢলে পড়লেন।

দেশের স্বাস্থ্য সেক্টর তথা সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষা উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতেন ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু। এ সেক্টরে যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে একাই লড়াই করার সাহস রাখতেন। যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন সে প্রতিষ্ঠানের অন্যায় দেখলেও গণমাধ্যমের শুভাকাঙ্ক্ষিদের জানিয়ে দিতেন। গণমাধ্যমের (প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন) সম্পাদক থেকে জুনিয়র রিপোর্টার সবার প্রিয় ছিলেন ডা. লিটু। সবার আপদে-বিপদে সাড়া দিতেন। হৃদরোগজনিত সমস্যা নিয়ে কেউ ফোন করলে তার এক কথা- দ্রুত চলে আসুন, বাকি দায়িত্ব আমার। তার মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শোকের মাতম চলছে। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ ও বিভিন্ন স্মৃতিচারণ করে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ আবেগঘন স্ট্যাটাস দিচ্ছেন।

একজন ক্ষুদে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে দেড় যুগেরও বেশি সময় যাবৎ তার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা। ছোট ভাই হিসেবে সবসময় পাশে রেখেছেন, বড় ভাই হিসেবে পাশে থেকেছেন। আজ সকালে একসময়ের সহকর্মী পীর হাবিব ভাইয়ের স্ট্যাটাসে ডা. লিটুর অসুস্থতার খবর পেয়ে বুকটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে। কিন্তু ভুলেও কল্পনা করতে পারিনি তিনি মারা যাবেন। মৃত্যু অনিবার্য। একদিন সবার চলে যেতে হবে। কিন্তু কারও কারও মৃত্যুতে দেশের, জাতির ও দরিদ্র মানুষের বিরাট ক্ষতি হয়। ডা. লিটুর মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো বহুসংখ্যক রোগীর। বিশেষ করে গরিব ও অসহায় রোগীদের। আর এ কারণেই তার মৃত্যুতে রোগীরা কাঁদছেন। কফিনে শুয়ে কি তিনি সেই কান্না শুনতে পাচ্ছেন ডা. রাকিবুল ইসলাম লিটু?

Related Post

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •