বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ ( সাঃ )- বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনই হয়েছিল বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে। তিনি সর্বদা উম্মতের কল্যাণ চিন্তায় থাকতেন। তার বর্ণিত হাদিসগুলো কেয়ামত পর্যন্ত উম্মতকে পথের দিশা দেখিয়ে যাবে।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশাল হাদিসে ভাণ্ডার থেকে চয়ন করে উম্মতের জন্য বিশেষ ১১টি উপদেশ এখানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। ওই সব উপদেশ মালায় হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

১. যদি পরিপূর্ণ ঈমানওয়ালা হতে চাও, তবে উত্তম চরিত্র অর্জন করো।
২. যদি সবচেয়ে বড় আলেম বা জ্ঞানী হতে চাও, তবে তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অর্জন করো। ৩. যদি সবচেয়ে বেশি সম্মান পেতে চাও, তবে মানুষের নিকট হাত পাতা (অন্যের ওপর ভরসা করা, ভিক্ষা করা) বন্ধ করে দাও। ৪. যদি আল্লাহর নিকট বিশেষ সম্মান পেতে চাও, তবে অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করো। ৫. যদি রিজিকের প্রশস্ততা চাও, তবে সর্বদা অজুর সঙ্গে থাকার চেষ্টা করবে। ৬. যদি সমস্ত দোয়া কবুল হওয়ার আশা রাখো, তবে অবশ্যই হারাম থেকে বেঁচে থাকবে। ৭. যদি কেয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে গুনাহমুক্ত উঠতে চাও, তবে সহবাসের পর দ্রুত পবিত্র হয়ে যাবে। ৮. যদি কেয়ামতের দিন আল্লাহর নূর নিয়ে উঠতে চাও, তবে মানুষের ওপর জুলুম করা ছেড়ে দাও। ৯. যদি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে চাও, তবে আল্লাহর ফরজ বিষয়াদির প্রতি যত্নবান হও। ১০. যদি জাহান্নামের আগুন নেভাতে চাও, তবে দুনিয়ার বিপদাপদে সবর করো। ১১. যদি আল্লাহতায়ালার রাগ বা গোস্বা থেকে বাঁচতে চাও, তবে গোপনে সদকা করো, আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলো এবং মানুষের ওপর রাগ করা ছেড়ে দাও, আল্লাহতায়ালা সবাইকে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এসব উপদেশ মেনে চলার তওফিক দান করুন। আমিন।

মহানবী (সা.) রাতের বেলা কি কি আমল করতেন? রাসূলে পাক (সা.) রাতের বেলা খুব কম সময়ই ঘুমিয়ে কাটিয়েছেন। তিনি রাতের বেশিরভাগ সময়েই মহান আল্লাহ তায়ালার ইবাদতে মোশগুল থাকতেন। কোন কোন রাত তিনি না ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন। রাসূল (সা.) এর রাতের বেলার আমল সম্পর্কে জেনে, আমাদের প্রত্যেকেরই সেখান থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। এ প্রসঙ্গে একটি হাদিস নিচে বর্ণনা করা হলো।

আরবি হাদিস
وَعَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ عَنهَا، قَالَتْ: كَانَ النَّبِيُّ ﷺ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ إحْدَى عَشرَةَ رَكْعَةً، فَإِذَا طَلَعَ الفَجْرُ صَلَّى رَكْعَتَيْنِ خَفِيفَتَيْنِ، ثُمَّ اضْطَجَعَ عَلَى شِقِّهِ الأَيْمَنِ حَتَّى يَجِيءَ الْمُؤَذِّنُ فَيُؤْذِنَهُ . متفقٌ عَلَيْهِ

বাংলা হাদিস: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে এগারো রাকআত নামায পড়তেন। যখন ফজর উদয় হত, তখন তিনি দু’রাকআত সংক্ষিপ্ত নামায পড়তেন, তারপর তাঁর ডান পার্শ্বে শয়ন করতেন; শেষ পর্যন্ত মুআয্যিন এসে তাঁকে (জামাআতের সময় হওয়ার) খবর জানাত।’ [বুখারি ৬২৬, ৯৯৪, ১১২৩, ১১৩৯, ১১৪০, ১১৬০, ১১৬৫, মুসলিম ৭২৪, ৭৩৬, ৭৩৭, ৭৩৮, তিরমিযি ৪৩৯, ৪৪০, নাসায়ি ৬৮৫, ১৬৯৬, ১৭৪৯, ১৭৬২, আবু দাউদ ১২৫৪, ১২৫৫, ১২৬২, ১৩৩৪, ১৩৩৮, ১৩৩৯, ১৩৪০]

যে কাজ করলে সহজেই প্রিয়নবির আপন হওয়া যায়, প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চিরস্থায়ী আপনজন হতে কী করবেন? কী এমন কাজ আছে, যে কাজ করলে সহজেই প্রিয়নবির আপন হওয়া যায়। কেয়ামতের কঠিন পরিস্থিতিতেও তারা ছোট ছোট সে আমলের কারণে তাঁর খুব কাছে থাকবেন। হাদিসে পাকে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের মুক্তির জন্য ছোট ছোট অনেক নসিহত পেশ করেছেন। যে নসিহতগুলোর আমল একেবারেই সহজ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে সেই ব্যক্তি, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দরূদ পাঠ করবে।’ (তিরমিজি) প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণের মর্যাদা ও গুরুত্ব কত বেশি, তা পবিত্র কুরআনে ওঠে এসেছে। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয় আল্লাহ (উর্ধ্ব জগতে ফেরেশতাদের মধ্যে) প্রিয়নবির প্রশংসা করেন এবং তার ফেরেশতাগণ প্রিয়নবির জন্য দোয়া করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও নবির ওপর দরূদ পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।’ (সুরা আহযাব : আয়াত ৫৬) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি দরূদ ও সালাম প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। আর এ কারণেই অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, কোনো ব্যক্তি যখন প্রিয়নবির নাম উল্লেখ করবে কিংবা শুনবে, তখন তার ওপর দরূদ পাঠ করা আবশ্যক হয়ে যাবে।’ (কুরতুবি, ফাতহুল কাদির) রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তার প্রতি দরূদ পাঠের ফজিলত বর্ণনা করে বলেন- ‘যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করবেন।’ (আবু দাউদ) তিনি আরও বলেন, ‘যার সামনে আমার নাম উচ্চারিত হয় তার উচিত আমার ওপর দরূদ পাঠ করা। (মুসনাদে আহমদ, নাসাঈ) প্রিয়নবি আরও বলেন, সেই ব্যক্তি কৃপণ, যার সামনে আমার নাম উচ্চারণ করা হলে (সে) দরূদ পাঠ করে না।’ (তিরমিজি), অন্য হাদিসে এসেছে, ‘সেই ব্যক্তি অপমানিত হোক, যার সামনে আমার উচ্চারণ করা হলে সালাত পাঠ করে না।’ (তিরমিজি)

পরিশেষে… প্রিয়নবির নাম উচ্চারণ কিংবা শোনার পর যদি কেউ দরূদ পাঠ না করে তার পরিণাম প্রসঙ্গে জিবরিল আমিনের একটি ঘোষনা উল্লেখ করে শেষ করতে চাই। তাহলো- একবার প্রিয়নবি মসজিদে নববিতে খুতবা দিচ্ছেন। এমন সময় তিনি পরপর তিনবার আমিন বললেন। সাবাহায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি তিনবার আমিন বললেন কেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন জানালেন, (তন্মধ্যে একটি) ‘জিবরিল আমিন জানালেন যে আল্লাহ তাআলা বলেছেন- যে ব্যক্তি আমার (প্রিয়নবির) নাম উচ্চারণ করলো কিংবা শুনলো কিন্তু আমার প্রতি দরূদ পাঠ করলো না, সে অভিশপ্ত।’ (নাউজুবিল্লাহ) সুতরাং উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য সতর্কতা হলো- প্রিয়নবির নাম উচ্চারণ কিংবা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি দরূদ পাঠ করা জরুরি। আর প্রিয়নবি তো হাদিসে পাকে ঘোষণাই দিয়েছেন যে, যারা যত বেশি দরূদ পাঠ করবে, তারা কেয়ামতের দিন প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ততবেশি নিকটবর্তী হবে।’ আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে প্রিয়নবির নাম উচ্চারণ কিংবা শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতি দরূদ পড়ার তাওফিক দান করুন। দুনিয়ায় রহমত লাভ এবং কেয়ামতের কঠিন সময়ে তাঁর সবচেয়ে নিকটবর্তী হতে বেশি বেশি দরূদ পড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Related Post