[সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রাহ.-এর আম্মার কথা তিনি বলতেছেন।

যে আমি চোখ মেলেছি এমন এক ঘরে যেখানে আল্লাহ তাআলা দ্বীন ও দুনিয়া উভয়টার সৌন্দর্য দান করেছেন।
আমার দাদা মৌলভী সায়্যিদ সাঈদুদ্দীন সাহেব সায়্যিদ আহমদ শহীদ রাহ.-এর মুরীদ এবং দুনিয়াবী দিক থেকেও একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন। আমার আব্বা এবং চাচাজান উত্তরাধিকার সূত্রে অনেক সম্পদের মালিক হয়েছিলেন। চাচাজান সায়্যিদ রশীদুদ্দীন সাহেব অর্থ-সম্পদ দেখাশোনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নিলেন। আর আব্বাজান শাহ যিয়াউদ্দীন রাহ. ইলম ও সুলূকের দিকে মনোনিবেশ করলেন। একদিকে তিনি বেশ বড় আলেম অন্যদিকে আবার শায়েখ ও মুর্শিদ ছিলেন। দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্ররা আসত এবং শিক্ষা অর্জন করত। আব্বাজানের সম্পদের অংশটুকু হয়ত মেহমানদারীতে কিংবা কিতাব সংগ্রহে ব্যয় হত। এভাবে তাঁর নিকট দুর্লভ এবং মূল্যবান কিতাবাদীর বিশাল ভাণ্ডার জমা হয়ে গেল এবং তাতে সব বিষয়ের কিতাব মওজুদ ছিল।

মুহতারামা আম্মাজান অত্যন্ত নেককার এবং অনেক ইলমের অধিকারী ছিলেন। তাঁর কাছেই আমি কুরআন শরীফ নাজেরা পড়েছি। একবার ছাড়া তিনি কখনো আমাকে ধমক দেননি এবং প্রহারও করেননি।
শৈশবে আমারা মাঝে খেলাধুলার আগ্রহ খুবই কম ছিল। বাচ্চাদের সাথে উঠা-বসারও তেমন সুযোগ হয়নি। আম্মাজানই আমাকে কুরআন তরজমা পড়িয়ে দেন। ঐ সময় প্রচলন ছিল বাচ্চারা তরজমাওয়ালা কুরআন নিয়ে পড়ত।
কুরআন শরীফ নাযেরা পড়ার পর আমার মাঝে হিফয করার আগ্রহ তৈরি হল এবং মেহনত করে কিছু সবকও তৈরি করলাম। ভাই মৌলভী হাফেয উবায়দুল্লাহ মরহুমের কাছে হিফয শুরু করে দিলাম এবং আল্লাহর অশেষ রহমতে তিন বছরে হিফয শেষ হল।

আমি যখন কুরআন হিফয শুরু করলাম তখন আমার বড় বোন এবং চাচাত ভাই সায়্যিদ খলীলুদ্দীন সাহেব অনেক খুশি হলেন। প্রতি সপ্তাহে আমাকে দাওয়াত দিতেন। আমার হিফয শেষ হওয়ার পর তাঁরা বিরাট এক দাওয়াতের আয়োজন করলেন এবং অনেক আনন্দ প্রকাশ করলেন। উদর্ কী পহেলী কিতাব এবং দ্বীনিয়াত কী পহেলী কিতাব পড়ার পর আরো অনেক কিতাবাদী মুতালাআ করা শুরু করলাম। আব্বাজানের কাছে তো সব ধরনের কিতাবই মওজুদ ছিল।
একবার কিসসায়ে শাহে রুম এবং হালীমায়ে দাঈ কিতাব দুটি আমার হাতে এল। আমি পড়া শুরু করলাম। তখন আমার ভাই মুহতারাম খলীলুদ্দীন সাহেব আমাকে ঐগুলো পড়তে দেখে বললেন, এসব কিতাব পড়ো না; এগুলোর বর্ণনা নির্ভরযোগ্য নয়। এর পরিবর্তে মালাবুদ্দাহ মিনহু এবং রাহে নাযাত পড়। ঐ কিতাবগুলোও আম্মাজানের নিকট পড়। কিতাবদুটি মাসায়েল সংক্রান্ত হওয়ায় মাসআলার সাথে আমার একটা আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল এবং কিছু মাসআলাও শেখা হয়ে গেল।
তারীখের কিতাব কাসাসুল আম্বিয়া এবং ফুত‚হুশ শামের দ্বারা খুবই প্রভাবিত হলাম। ফুত‚হশ শামের উর্দূ তরজমা আমার এক শ্রদ্ধাভাজন মিয়া আবদুর রশীদের ঘর থেকে আমার আম্মা এনেছিলেন। কিতাবটি আমরা উভয়ে পড়লাম।

সাহাবায়ে কেরামের অবস্থাসমূহ এবং তাঁদের জিহাদ বিষয়ক আলোচনা পড়ে মনের মাঝে আবেগ-জযবার ঢেউ এসে যেত। এর কিছুদিন পর আমার মামা সায়্যিদ আবদুর রাযযাক কালামী টোঁকী কবিতা আকারে ফুত‚হুশ শামের উর্দূ তরজমা করলেন, যার নাম ‘ছামছামুল ইসলাম’। টোঁক থেকে কোনো এক ভাই নিয়ে এসেছিলেন। তাও পড়লাম। আরো অন্যান্য নারীরাও পড়া শুরু করল।
আমাদের ঘরে অনেক মহিলা জমা হত এবং সবাই তা অত্যন্ত আগ্রহের সাথে পাঠ করত। ছোট বড় সবাই তা শুনে ঈমানী জযবায় উদ্বেলিত হত।
ঐ কিতাবটি আমি অনেকবার পড়েছি। তা মনের মাঝে এতই প্রভাব সৃষ্টি করল, মনে হত আমরাও যদি পুরুষ হতাম এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে শরীক হতে পারতাম অথবা ঐ মহিলাদের মধ্যে শামিল হতাম, যাঁরা ঐ বরকতময় জিহাদে শরীক হয়েছেন!

মাআছিরুস সালেহীন পড়ে বুযুর্গদের মহব্বত এবং তাঁদের মত হওয়ার আগ্রহ সৃষ্টি হতে লাগল। কিতাবদুটি বারবার পড়েছি। যার দরুন আজ এতদিন পরও তাঁদের ঘটনাবলী মনের মাঝে গেঁথে আছে। বুযুর্গদের সম্মান ও মহব্বত যা কিছু মনের মধ্যে আছে তা শুধু ঐ কিতাবগুলোর বরকতেই এবং এখনো মনে হয় আল্লাহ যদি তাঁদের মত হওয়ার তাওফীক দিতেন!
আমার মুহতারাম ভাই ও মুরুব্বী মৌলভী সায়্যিদ খলীলুদ্দীন সাহেব অধিকাংশ সময় যখন ঘরে আসতেন তখন হালী মরহুমের প্রসিদ্ধ কিতাব মুসাদ্দাসে হালী পড়ে শুনাতেন। তাঁর কাছ থেকে শুনে আমারও পড়তে ইচ্ছা হল এবং পড়া শুরু করলাম। এত বেশি পড়লাম যে, শে‘রগুলো মুখস্থ হয়ে গেল। পাশাপাশি মামা হাকীম ফখরুদ্দীন মরহুমের মুসাদ্দাসে খিয়ালীও পড়লাম। এ দুটি কিতাবের অধিকাংশ শে‘র বলার খুব অভ্যাস ছিল। উঠা-বসা, কাজ-কর্ম ইত্যাদির মাঝে মনে মনে শে‘র পাঠ করতাম।

সকালে কুরআন তিলাওয়াতের পর কিছু হাদীস পাঠ করতাম। এটা আমার দৈনন্দিন মামূল হয়ে গিয়েছিল। নওয়াব সিদ্দীক হাসান সাহেবের কিতাব ‘তয়্যিল ফারাসিখ ইলা মানাযিলিল বারাযিখ’ আমার কাছে ছিল। তাও পড়লাম। কিতাবটি পড়ে মনের অবস্থা পরিবর্তন হয়ে গেল। কবরের অবস্থাসমূহ পড়ে দুনিয়ার প্রতি অত্যন্ত অনাগ্রহ বোধ করলাম। মন তো পূর্বেই দুর্বল ছিল। এখন তা পরিবর্তন হয়ে মানসিক অসুস্থতার রূপ নিল। আমার ঐ অসুস্থতা দুই বছর পূর্ণরূপে বিদ্যমান ছিল। এ অবস্থায়ই মিশকাত শরীফের তরজমা ‘তরীকুন নাজাত’ পড়া শুরু করলাম। সেখানে হাদীসের একটা ঘটনা পেলাম-

একবার হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কিরাম রা.-কে নিয়ে মদীনার বাজার অতিক্রম করছিলেন। পথে একটি কানকাটা মৃত বকরি পড়ে থাকতে দেখলেন। তিনি আরয করলেন, কে আছ এ বকরিটাকে এক দিরহামের বিনিময়ে কিনে নেবে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, কে আবার এটা এক দিরহাম দিয়ে কিনবে? এটা দিয়ে আমরা কী করব? নবীজী বললেন, তাহলে বিনামূল্যে কি কেউ তা নিবে? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, জীবিত হলেই তো কানকাটা হওয়াটা এর জন্য দোষের ছিল, সেখানে মৃত! তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরয করলেন, তোমাদের কাছে এই বকরিটা যেমন মূল্যহীন, আল্লাহর দৃষ্টিতে এই দুনিয়া তার চেয়েও বেশি মূল্যহীন। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৯৫৭

এই ঘটনার পর মন দুআর দিকে আরো বেশি ধাবিত হল। চলতে-ফিরতে, উঠতে-বসতে দুআ পাঠ করতাম। দুআর প্রতি আমার অধিক মনোযোগ দেখে কিছু সমবয়সী হাসাহাসি করত। এ অবস্থার মধ্যে আমার কাছে আরো একটা নতুন কিতাব এল। ঐ কিতাব আমার জন্য বিরাট এক নিআমত ছিল। ঐ কিতাবের আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য হল, প্রত্যেকটা পংক্তি আল্লাহর নামে শুরু করা হত অথবা তাঁর নামে শেষ করা হত। দ্বীন-দুনিয়ার সমস্ত কামনা-বাসনা তাতে পেশ করা হয়েছে। কিতাবটি আমি মুখস্থ করলাম এবং সার্বক্ষণিক সঙ্গী বানিয়ে নিলাম। আসর নামাযের পর কিছু মহিলা আসত। সবাইকে নিয়ে ঐ মুনাজাতগুলো জোরে জোরে পাঠ করতাম। যখন কোনো পেরেশানী; কিংবা বিপদের সময় আসত তখন ঐ দুআগুলো পড়তাম এবং আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহ লাভ করতাম। ধারাবাহিকভাবে এমন কিছু ঘটনা সংঘটিত হল, যার দরুন মন আরো বেশি দুআ-মুনাজাতের দিকে ঝুঁকে পড়ল। সর্বদা অত্যন্ত আবেগের সাথে দুআ-মুনাজাতগুলো পড়তাম। যখন পেরেশানী বেড়ে যেত কেঁদে কেঁদে বলতাম-
ترا شيوه كرم ہے اور میری عادات گدائى كى + نہ ٹوٹے آس اے مولى ترے دركےفقيروں كى
তোমার গুণ উদারতা ও দানশীলতা আর আমার স্বভাব অবাধ্যতার!
আয় মাওলা! তোমার দুয়ারের ফকীরদলের আশা যেন ভঙ্গ না হয়।

সিজদায় পড়ে যেতাম এবং কেঁদে কেঁদে আল্লাহর কাছে দুআ করতাম। আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ দুআ ও মুনাজাতের পর প্রশান্তি অনুভব করতাম। তবীয়ত এত স্বাভাবিক মনে হত, যেন রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে। আর আমি খাযানায়ে রহমতের মাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ছি।
আকিদাগত দিক থেকেও আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ, আমার খান্দান তাওহীদ ও সুন্নতের ধারক-বাহক ছিলেন। বিশেষভাবে সায়্যিদ আহমদ শহীদ রাহ.-এর কারণে ঘরে ঘরে তাওহীদের চর্চা হত। এখানে একজন বোন ছিলেন, যিনি একশ বছর পর্যন্ত হায়াত পেয়েছেন। তিনি হযরত শহীদ রাহ.-কে দেখেছেন। তিনি বলতেন, হযরত রাহ. অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। নিজের হাতের আঙ্গুলে বাচ্চাদেরকে ঝুলিয়ে রাখতে পারতেন।

হযরত মাওলানা ইসমাঈল শহীদ রাহ.-এর ‘তাক্ববিয়াতুল ঈমান’ এবং খুররম আলী রাহ.-এর ‘নাসীহাতুল মুসলিমীন’ও মুতালাআয় ছিল। শিশু, নারী, পুরুষ সবাই তা পাঠ করত।
এটাই হল আমার তালীম ও মুতালাআর কিছু চিত্র এবং শৈশবের কিছু অবস্থা। আল্লাহ তাআলা আমার সকল বোন ও মেয়েদেরকে ভালো কিতাবাদী পড়ার এবং নেক সোহবত, নেক তরবিয়ত পাওয়ার তাওফীক দান করুন।

Related Post

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •