এর পরে আর কত? বলতে পারেন? আজ থেকে প্রায় ৮/৯ মাস আগে ঠিক এইরকম একটা পোস্ট করেছিলাম আমি,সম্ভবত অনেকের ই মনে আছে। এই ধরনের ঘটনা আসলে লিখা বা বলার মত ইচ্ছাশক্তি কারোই থাকেনা। সবার মত আমি লিখার শক্তি ও হারিয়ে ফেলছি। কিন্তু না লিখে যে পারা যাচ্ছেনা!বিলিভ করেন,এখনো হাত কাপছে!! ছোট্ট ফুটফুটে বাচ্চা!!

বয়স মাত্র দেড় বছর। এই বাচ্চাটার মাথায় যখন পাথর এসে লাগে, তখন তাকে কতটুকু অসহনীয় ব্যাথা সহ্য করতে হয়েছে কল্পনা করতে পারেন? নাহ,সামনা সামনি না দেখলে হয়তো বুঝতে পারবেন না। মহান আল্লাহ তায়ালার কি ইচ্ছা তিনিই ভালো জানেন। বরাবরের মত আমাকে চিকিৎসা সেবা দিতে প্রস্তুত রেখেছিলেন তিনি। ঠিক আগের ই মতন। তবে আগের বার আংকেল (মুরব্বি মানুষ ছিলেন) এবারে ফুটফুটে বাচ্চা। এর আগের বার আমার কাছে কটন,ভায়োডিন, ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ,পেইনকিলার ছিলো। এবার ব্যাগ গোছাতে গিয়ে কি মনে করে জানি মনে হচ্ছিলো ওয়াল টাইম বেন্ডিজ এর সাথে আরো কিছু ভালো ভাবে নিয়ে নেই। একটা ছোট পেন্সিল ব্যাগ এ ভায়োডিন,কটন,গজ,ব্যান্ডিজ,স্কচটেপ বহন করলাম।বারবার মনে হচ্ছিলো…ট্রেনে যাতায়াত করি। এইবার বুঝি আমার সাথেও এমন হবে৷ যার সাথেই হোক,কাজে লাগবে হয়তো। কি অদ্ভুত!! আল্লাহ কেন জানি তেমন টাই করলেন। ট্রেনের কোথা থেকে যেনো একটা ভাইয়াও কিছু জিনিস নিয়ে এলো। আরো সহজতর হলো। সবাই মিলে বাচ্চাটাকে ধরলো। কিন্তু বিশ্বাস করেন,ও ধরনের ঘটনা একদম ই কাংখিত নয়,তবে ভয় আর সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেই বহন করেছিলাম নিজের সাথে। সবসময় জিনিসগুলো আমার সাইড ব্যাগে ই রাখি!! এবার আমি বসেছিলাম একদকম সামনের দিকে ১২ নম্নর সীটে। আর বাচ্চাটার দূর্ঘটনা ঘটে একদম পেছনের দিকে। ৯০ এর দিকের সীট। কান্নাকাটি আর সকলের ব্যাস্ততা দেখে দৌড়ে গেলাম। এত মানুষ ভীড় করেছিলো যে বাচ্চাটার কাছে যাওয়া সহয হচ্ছিলো না। আমি মেডিকেল স্টুডেন্ট এবং হাতে জিনিসপত্র দেখেই সাথে সাথে সবাই জায়গা ছেড়ে দিলো।আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করলাম!!

আজ যেই ছবিটা পোস্ট করলাম এইটা ঘটনা ঘটার প্রায় ৩০ মিনিট পর৷ কারন যখন ঘটনা টা ঘটে তখন বাচ্চাটাকে নিয়ে, রক্তপাত বন্ধ করা এবং এত মারাত্মক ছবি তোলার মত সময়, সাহস,ইচ্ছা কোনটাই আমার ছিলো না। যদিও আশেপাশের অনেকেই ছবি তুলেছে। যাই হোক, অসহনীয় যন্ত্রনা কাতর বাচ্চাটার কান্না,তার নানি,ছোট্ট আরেকটা ভাই এর কান্নায় এই বগীতে থাকা প্রত্যেকটা মানুষ হতভম্ব হয়ে পরেছিলো। মুরব্বি টাইপের আন্টি গুলা পর্যন্ত নিজের আগেব কে ধরে রাখতে পারে নি।যখন ওয়াশ দিচ্ছিলাম হাত টা আমার ই কাপছিলো।আমার দু হাত রক্তে মেখে গিয়েছিলো। কিভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করেছি আল্লাহ জানেন!!এত্ত ছোট বাচ্চাটেকে চাপ দিয়ে ব্লিডিং বন্ধ করা টা সহয ছিলো না৷ কয়েকজন ভাইয়ার সাহায্য নিয়ে শক্ত করে মাথাটা ধরতে হয়েছিলো। ডান চোখের কোনেও ফেটে গিয়েছিলো। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো বাচ্চাটা যেখানে বসে ছিল নানীর কোলে সেই পাশের জানালাটা বন্ধ ছিলো। কাচ ভেংগে এসে বাচ্চাটার ফ্রন্টাল এরিয়ায় লাগে। নিমিশেই রক্তপাত।। মাথায় যতটুকু ফাটা ছিলো সেইটাই বেশি ভয়ের কারন ছিলো।আমি ভেবেছিলাম এমন ব্যান্ডিজ আপাতত ব্লিডিং বন্ধ করবে কিনা। আল্লাহর অশেষ রহমত। বাচ্চাটা ৩০ মিনিট পর ঘুমিয়ে গিয়েছে। ভয় পাচ্ছিলাম পেইন কলার ছাড়া ও ঘুমাবে কিনা। কি অদ্ভুত,৩০ মিনিট অবিরত কান্নার পর বেন্ডেজ দেয়ার সাথে সাথেই সে ঘুমিয়ে গেলো। বাচ্চার নানির কান্না থামাতে কষ্ট হয়েছিলো। আর একটা কথা প্রসংগক্রমে লিখতে হলো।দরিদ্র পরিবারের এই নানি খুব অসহায়। জয়পুরহাট তাদের বাড়ি৷ যেতে যেতে বিকেল ৫ টা বাজবে সম্ভবত। চিকিৎসার খরচ টা বহন করতে অপারগ৷ তাই কান্না আরো ভারী গয়ে উঠেছিল। একটা আংকেল এর উদ্যোগ কে স্বাগত জানালাম। নিজ হাতে পুরা বগীতে টাকা তুললেন তিনি সাহায্যের জন্য। ওনার ছবিও দিলাম। মানুষ মানুষের জন্য-আরেকবার প্রমানিত!!

যাই হোক,এই হলো আমার সাথে ঘটে যাওয়া ট্রেইন এ চলাচলের ২য় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা,যেটা কারো সাথে ঘটুক -এমনটা কাম্য নয়!! আজ আর বলবো না শেয়ার করে সচেতনতা বারান। শুধু জিজ্ঞেস করবো এর প্রতিকার কি? পুলিশ এসে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং বাচ্চাটার পরিবারের ইন ডিটেইলস লিখছিলো। সম্ভবত ডাটা কালেকশন – কত জন এই পর্যন্ত সম্মুখীন হলো। এই আর কি!! এটা ছাড়া ই বা আর কি করার আছে এদের?? ভাষা হারিয়ে ফেলছি বারবার। ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় গুরুতত আহত থেকে শুরু করে মৃত্যুর খবর পর্যন্ত নতুন নয়। কি এর প্রতিকার?? প্রশ্ন রয়ে যাবে বারবার!!

post: নুসরাত তামান্না
https://web.facebook.com/nusrat.tamanna.7/posts/1850906551703865

Related Post