সন্তানদের রক্তাক্ত লাশ রেখে সাততলা ভবন খুঁজছিলেন মা তানজিনা

দুই সন্তানের রক্তাক্ত লাশ ঘরের ভেতরে রেখে রাতভর উত্তর বাসাবোর বিভিন্ন অলিগলিতে নিজের বাসা খুঁজেছেন মা তানজিনা রহমান। উত্তর বাসাবোর মসজিদ গলিতে থাকা টহল পুলিশের কাছে ছয়তলা ভবনের ঠিকানা জানতে চাইলে পুলিশ তাকে আটক করে সবুজবাগ থানায় নিয়ে যায়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও তার কথায় অনেক অসঙ্গতি রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দুপুরে বাসায় ছোটভাই আসায় ভালো খাবার রান্না করেছিলেন তানজিনা। তার স্বামী, সন্তান ও ছোটভাইসহ সবাই সে খাবার খায়। এরপর রাতেই এই ঘটনা।

সবুজবাগ থানার পুলিশ ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে এ সব তথ্য জানা গেছে।

শুক্রবার রাতে রাজধানীর উত্তর বাসাবোর ১৫৭/২ নম্বর ছয়তলা ভবনের চিলেকোঠায় দুই ভাই-বোনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত দুই শিশু হলো- হুমায়রা বিনতে মাহবুব তাকিয়া (৬) ও মাশরাফি ইবনে মাহবুব আবরার (৭)।

এ ঘটনায় শনিবার ভোরে সবুজবাগ থানায় নিহত শিশুদের বাবা মা তানজিনা রহমানকে একমাত্র আসামি করে মামলা দায়ের করেন।

এ বিষয়ে সবুজবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কুদ্দুস ফকির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নিহত দুই শিশুর বাবা মাহবুবুর রহমান এ ঘটনায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় নাম উল্লেখ করা একমাত্র আসামি শিশুদের মা তানজিনা রহমান। আমরা তাকে গ্রেফতার করেছি। আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড চাইলে আদালত পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। তাকে আজ থেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

তানজিনা রহমানকে গ্রেফতারের বিষয়ে ওসি বলেন, ঘটনা জানার পরপরই আমরা পুরো এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে দেই। টহল পুলিশ বৃদ্ধি করে লাশ উদ্ধারে কাজ করি। রাতভর আমরা আলামত সংগ্রহ, লাশ উদ্ধার ও সুরতহাল প্রতিবেদন করে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠাই।

নিহত ভাই-বোনের মরদেহ নিয়ে যাচ্ছে পুলিশতিনি (ওসি আব্দুল কুদ্দুস ফকির) বলেন, ঘটনার পর থেকেই নিহত শিশুদের মা নিখোঁজ ছিলেন। আমরা তাকে খুঁজছিলাম। রাত সাড়ে ৪টা বা ৫টার দিকে সবুজবাগের মসজিদ গলিতে তিনি হাঁটাহাঁটি করছিলেন। এ সময় আমাদের টহল পুলিশ তাকে জেরা করে। তিনি কোথায় যাবেন? জানতে চাইলে, তানজিনা বলেন, ‘বাসাবোর সাততলা (চিলেকোঠাসহ) ভবন খুঁজতেছি।’ এসময় পুলিশের সন্দেহ হয়। পরে পুলিশও তাকে বলে, আমরাও সাততলার মানুষ খুঁজতেছি। এরপর তাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়।

শনিবার সকালে তাকে পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে। এসময় তানজিনা প্রাথমিকভাবে হত্যার বিষয় স্বীকার করলেও পুলিশ এবিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনও কথা বলতে চায়নি।

তবে সবুজবাগ থানার অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, সকাল থেকে তানজিনা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছিলেন। তার ভেতরে কোনও অনুতাপ নেই। সন্তানদের মৃত্যুর বিষয়ে তার কাছে পুলিশ বারবার জানতে চাইলে তিনি জ্বিন, গায়েবি নির্দেশনা এসব কথা বলছিলেন। এখন কেউ তাকে কিছু করতে পারবে না বলেও পুলিশকে বলেন তিনি।

ওসি বলেন, তদন্তাধীন বিষয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করতে চাই না। তদন্ত শেষ হলে এ বিষয়ে বলা যাবে।

শিশুদের বাবা মাহবুব রহমান মামলার এজাহারে উল্লেখ করেন, ‘২০০৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি তানজিনা রহমানের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ের এক বছর পর আমার শ্বশুরবাড়ি ১৭ গিলগাঁও বাগিচায় থেকে আসছিলাম। এবছরের ১ জানুয়ারি থেকে উত্তর বাসাবোর ১৫৭/২-এর ছয়তলার চিলেকোঠা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করি। আমার এক ছেলে মাশরাফি ইবনে মাহবুব আবরার (৭) ও মেয়ে হুমায়রা বিনতে মাহবুব তাকিয়া (৬)। আমার ছেলে খিলগাঁও বাগিচার হাফেজিয়া মাদরাসার নুরানী শাখার ছাত্র। মেয়ে দীপ শিখা কিন্ডারগার্টেনের কেজি শ্রেণির ছাত্রী। ১২ আগস্ট শুক্রবার আমার ছোট শ্যালক আহসানুল হক মিঠু আমাদের বাসায় আসে। সে মগবাজারের একটি আবাসিক স্কুলে থেকে পড়ালেখা করে। দুপুরে বাসায় ভালো খাবার রান্না করা হয়। সবাইকে নিয়ে খাবার খেয়ে সন্ধ্যার দিকে শ্যালককে নিয়ে মগবাজারে যাই। তখন আমার স্ত্রী ও দুই সন্তান বাসায় ছিল।

আমি আমার শ্যালককে মগবাজারে পৌঁছে দিয়ে উত্তর বাসাবোর ঝিলপাড় মসজিদে এশার নামাজ পড়ি। নামাজ শেষে রাত সোয়া ৯টার দিকে আমার ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান আমার মোবাইল ফোনে ফোন করে। সে জানায়, তাকে বাড়ির মালিক ফোন করে জানিয়েছেন, আমার বাসার সামনে রক্ত দেখা যাচ্ছে। আমি দ্রুত বাসায় এসে বাড়িওয়ালাসহ বাসার সামনে যাই। এসময় দরজায় হ্যাজবল লাগানো ছিল। দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করা মাত্র প্রথমে রুমে আমার মেয়ে তাকিয়ার গলাকাটা রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাই। দ্বিতীয় রুমে আমার ছেলের গলাকাটা রক্তাক্ত লাশ দেখতে পাই। এ সময় আমি আমার স্ত্রীকে চিৎকার করে ডাকতে থাকি। তাকে কোথাও পাই না। এরপর মোবাইল ফোনে বাড়িওয়ালা পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ এসে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে লাশের ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। আমার স্ত্রী তানজিনা ১২ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সোয়া ৯টার যে কোনও এক সময়ে চাপাতি দিয়ে গলাকেটে আমার দুই সন্তানকে হত্যা করেছে। এ বিষয়ে আইনগত গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।’

স্বজনের আহাজারিএদিকে, বাড়িওয়ালা আতিকুর রহমান বলেন, আমাদের কখনও মনে হয়নি এধরনের ঘটনা তানজিনা ঘটাতে পারেন। তাকে দেখলে এরকম মনে হয় না। কেউ বিশ্বাসও করবেন না। ঘটনার সময় আমি ও আমার স্ত্রী কেউ বাসায় ছিলাম না।’

নিহত শিশুদের ফুফু লাইলা নূর বলেন, ২০০৮ সালে তাদের পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পরপরই আমরা তার (শিশুদের মা) মানসিক সমস্যা বুঝতে পারি। এরপর ফার্মগেটের গ্রিন রোডের ডক্টরস চেম্বারে ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনকে আমরা দেখাই। ডাক্তার তার চিকিৎসা করে সব সময় ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন। শিশুদের মা সবসময় নামাজ রোজা করতেন, কোরআন তেলওয়াত করতেন।

শিশুদের মা কী ধরনের সমস্যায় ভুগছিলেন সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে লাইলা নূর বলেন, তিনি সাধারণত চুপচাপ থাকতেন। কারও সঙ্গে কোনও কথা বলতেন না। সন্তান বা স্বামীর প্রতি কোনও খেয়াল রাখতেন না। তবে যখন ওষুধ দেওয়া হতো, তখন তিনি ভালো থাকতেন। আর যখন ভালো থাকতেন, তখন সমস্যা জানতে চাইলে বলতেন, তিনি (শিশুদের মা) স্বপ্নে তার দুই সন্তানকে মেরে ফেলেছেন বা তার বাবা-মা (শিশুদের নানা-নানি) তাকে মেরে ফেলেছে অথবা তিনি তার স্বামীকে মেরে ফেলেছেন। এসব স্বপ্ন দেখে তিনি দুঃশ্চিন্তা করতেন।
তিনি আরও বলেন, গত ৩ জুন তারা সপরিবারে নারায়ণগঞ্জের আমাদের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন তিনি সুস্থ ছিলেন। আমাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদ নগরে। গত ঈদের তারা সেখানে গিয়েছিলেন।

লাইলা নূর বলেন, নিহত শিশুদের বাবা মাহবুব রহমান দুপুরে কোরবানির বিষয়ে কথা বলার জন্য আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। আমরা তিন ভাই-বোন সবসময় এক সঙ্গে কোরবানি দিয়ে থাকি। তখন তিনি বলেছিলেন, তারা সবাই ভালো আছেন। এরপর রাত সাড়ে নয়টার দিকে আমার ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান ফোনে জানায়, তাকিয়া ও আবরার আর বেঁচে নেই। তারপর আমি নারায়ণগঞ্জ থেকে এখানে ছুটে আসি।

তিনি আরও বলেন, খিলগাঁওয়ের বাগিচা এলাকায় নিহত শিশুদের নানার বাড়ি। তাদের নানা বেঁচে নেই। নানি, মামা ও খালারা সেখানে থাকেন। তাদের বাড়িও কুমিল্লার দেবীদ্বারে।

প্রতিবেশী আরিফুর রহমান বলেন, আমরা পাশাপাশি থাকি। কখনও তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন মনে হয়নি। কেন যে এমন করলো, তাও তো বুঝতে পারছি না!

Spread the love
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published.